বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনায় জটিল ও সময়সাপেক্ষ সরকারি প্রক্রিয়া বিনিয়োগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে—এমন মন্তব্য করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, নিয়ম-কানুনের জটিলতা কার্যত উদ্যোক্তাদের ওপর ‘সময়ের কর’ চাপিয়ে দিচ্ছে, যার ফলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত সংস্থাটির বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনুমোদন, লাইসেন্স ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এতটাই বিচ্ছিন্ন ও জটিল যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করতে হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যবস্থাপকরা তাদের মোট কাজের সময়ের গড়ে ১৩ শতাংশ ব্যয় করেন শুধুমাত্র সরকারি নিয়ম মেনে চলার পেছনে। যা অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। তবে দেশের ভেতরে এই চাপের তারতম্যও বড়। চট্টগ্রামে এই হার প্রায় ৪০ শতাংশ, আর বরিশালে তা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলে ব্যবসার কৌশল নির্ধারণ বা উৎপাদন বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
একটি ব্যবসার অপারেটিং লাইসেন্স পেতে গড়ে ২৮ দিন সময় লাগে। নির্মাণ অনুমোদন ও আমদানি লাইসেন্স পেতে লাগে প্রায় ৪৯ দিন। যা চীন বা ভারতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। নতুন ব্যবসা শুরু করাও ব্যয়বহুল। প্রায় ১০ হাজার ডলার খরচ লাগে, যা ছয় বছরের কম বয়সী অনেক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয়ের ১০ শতাংশের বেশি। এই বাস্তবতায় দেখা যায়, যেসব প্রতিষ্ঠান বেশি নিয়ন্ত্রক চাপের মুখে পড়ে, তারা প্রায় ১৯ শতাংশ কম বিনিয়োগ করে।
প্রতিবেদনটি দেখায়, দেশের উচ্চ উৎপাদনশীল ‘ফ্রন্টিয়ার’ প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম নিয়ন্ত্রক ঝামেলার মুখে পড়ে। তারা কম সময় ব্যয় করে এবং কম কর পরিদর্শনের সম্মুখীন হয়। অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি বাধার মুখে পড়ে, ফলে তাদের সম্প্রসারণের সুযোগ কমে যায়।
করনীতিতেও বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সাধারণ করহার ২৭.৫ শতাংশ হলেও তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের জন্য তা ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। এ ধরনের বিশেষ সুবিধার কারণে ২০২১ সালে মোট দেশজ উৎপাদনের ২.৪ শতাংশ সমপরিমাণ কর রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। যেখানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৮ শতাংশ।
রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো ২ শতাংশ সুদে ঋণ পেলেও অন্য খাতের উদ্যোক্তাদের দিতে হয় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের মাধ্যমে ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৯.২৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ বিতরণ করা হয়। ফলে ৪২ শতাংশ ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ঋণ রয়েছে, যেখানে অন্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই হার ২৯ শতাংশ।
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার ৯০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক খাতে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে ১০.৯ শতাংশ আমদানি শুল্ক দিতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের দ্বিগুণ। এর ফলে রপ্তানির তুলনায় দেশীয় বাজারে ব্যবসা করা বেশি লাভজনক হয়ে উঠছে। উৎপাদন ও সেবা খাতে প্রতি শ্রমিকের আয় দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের এক-তৃতীয়াংশ। বিশেষ করে সেবা খাতে ২০১৬ সাল থেকে উৎপাদনশীলতা স্থবির রয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, দেশের বেসরকারি খাতে একটি দ্বৈত কাঠামো তৈরি হয়েছে। একদিকে অল্পসংখ্যক উচ্চ উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক ছোট ও মাঝারি ব্যবসা। ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো মোট বিক্রয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ তৈরি করলেও তারা মাত্র ১৫ শতাংশ কর্মসংস্থান দেয়। বিপরীতে অধিকাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানে।
ব্যবসার সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহকে উল্লেখ করা হয়েছে। গড়ে মাসে ২৬ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে, যা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রয়ের প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতি করে। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে জেনারেটর ব্যবহার করে, এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক খাতে আসতে চায় না। কারণ তারা মনে করে, আনুষ্ঠানিক হলে খরচ ও ঝুঁকি বাড়বে, কিন্তু সুবিধা ততটা পাওয়া যাবে না। প্রায় ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনশীলতায় ছোট আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের সমতুল্য।
প্রতিবেদনটি ধাপে ধাপে সংস্কারের সুপারিশ করেছে। প্রথমে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা, পরে বাণিজ্য বাধা কমানো এবং শেষে সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ‘স্মার্ট ডিরেগুলেশন’ বা বুদ্ধিমান নিয়ন্ত্রণ শিথিলতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে নিয়ম সহজ করা এবং বেশি ঝুঁকির ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত বাড়তে থাকা কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণ করতে হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

