দেশের অন্যতম পুরোনো বেসরকারি ব্যাংক এবি ব্যাংক আর বড় করপোরেট ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দিকে ঝুঁকছে। ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহী জানিয়েছেন, আগের অতিরিক্ত করপোরেট ঋণনির্ভরতা ঝুঁকি বাড়িয়েছে। তাই এখন ঝুঁকি কমাতে ঋণ বিতরণকে বিস্তৃত ভিত্তিতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এই কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। ব্যাংকটির মতে, ছোট উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ ছড়িয়ে দিলে কোনো একক গ্রাহকের খেলাপি হওয়ার প্রভাব পুরো ব্যাংকের ওপর কম পড়বে।
ব্যাংকটি জানায়, বড় প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। তবে নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাছাই করা হবে এবং আগের নির্ভরযোগ্য গ্রাহকদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। অন্যদিকে নতুন প্রবৃদ্ধির মূল ভরকেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে এসএমই খাতকে।
নতুন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ডিজিটাল রূপান্তর। ব্যাংকটি শাখাবিহীন ঋণ প্রক্রিয়া চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। অনুমোদন পেলে ‘ন্যানো লোন’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন, স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মোবাইল প্ল্যাটফর্মে কাগজবিহীন ঋণ অনুমোদনের দিকে এগোচ্ছে ব্যাংকটি। এতে মানবীয় হস্তক্ষেপ কমবে, সময় বাঁচবে এবং খরচও কমবে। এছাড়া গ্রাহকের লেনদেন আচরণ ও ডিজিটাল তথ্য ব্যবহার করে ঋণ মূল্যায়ন আরও নির্ভুল করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে এই ডিজিটাল ব্যবস্থা এসএমই ঋণেও সম্প্রসারিত হবে।
এজেন্ট ব্যাংকিং ও উপশাখা বিস্তারে ব্যাংকটি এখনো প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে আছে। বর্তমানে তাদের এজেন্ট আউটলেট ২৬৪টি এবং উপশাখা ৬০টি। তবে এখন এই খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমানত সংগ্রহ ও গ্রাহকসেবা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
১৯৮২ সালের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৪৪ বছরে ব্যাংকটি একাধিক সংকট পার করেছে। প্রতিবারই গ্রাহকের আস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সুনামের কারণে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে। তবে বর্তমানে উচ্চ খেলাপি ঋণ ও লোকসানের কারণে ব্যাংকটি আবারও চাপে রয়েছে। তবুও গ্রাহকরা নির্বিঘ্নে টাকা তুলতে পারছেন, যা আস্থা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২০২৪ সালে ব্যাংক খাতে অনিশ্চয়তার মধ্যে হঠাৎ আমানত উত্তোলন বেড়ে যাওয়ায় তারল্য সংকট তৈরি হয়। ওই বছরে মোট আমানত প্রায় ৯ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ২৯২ কোটি টাকায়। তবে পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ আমানত বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকায়। এতে গ্রাহকদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।
ব্যাংকটির অনেক ঋণ পুনঃতফসিল বা স্থগিত অবস্থায় রয়েছে। ফলে আগামী দুই বছর পর্যন্ত বড় অঙ্কের অর্থপ্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ ২০২৭-২৮ সালের আগে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আশা করা যাচ্ছে না। খেলাপি ঋণ কমাতে স্বল্পমেয়াদে ২০-২৫ শতাংশ এবং দীর্ঘমেয়াদে ৩০-৪০ শতাংশ হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারেও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে।
ব্যাংকটি ব্যয় কমাতে বছরে ২৫ শতাংশ হ্রাসের লক্ষ্য নিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ খরচ কমানো সম্ভব হয়েছে।২০২৫ সাল থেকে শুরু হওয়া পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি। তবে পুরোপুরি স্থিতিশীলতায় ফিরতে এক দশক পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমান আর্থিক অবস্থার কারণে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই ব্যাংকটি। আপাতত লাভজনকতা ও স্থিতিশীলতা ফেরানোই প্রধান লক্ষ্য। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে পেশাদার ও সহযোগিতামূলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতীতের কিছু সমস্যার পেছনে সুশাসনের ঘাটতি থাকলেও এখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় করপোরেট ঋণে অতিরিক্ত নির্ভরতা ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি তৈরি করে। একাধিক বড় ঋণ খেলাপি হলে পুরো ব্যাংক সংকটে পড়ে। এক্ষেত্রে এসএমই খাতে ঋণ বিতরণ ঝুঁকি ছড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতির তৃণমূল পর্যায়ে প্রবৃদ্ধি বাড়াতেও এই খাত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত ও সহজ ঋণপ্রদান নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংকটির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া আরও গতি পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

