বাংলাদেশে উন্নয়ন খাতে সরকারি ব্যয় ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় অর্থনীতির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য কমানোর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিচালন ব্যয় বাড়তে থাকায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে সরকারের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হতে পারে। ফলে উন্নয়ন ব্যয় আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারকে নিয়মিত ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় জিডিপির মাত্র ১.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। অথচ ২০২১ সালে এই হার ছিল ৪.৭ শতাংশ। পরবর্তী বছরগুলোতেও তা ধীরে ধীরে কমেছে। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় বেড়ে ২০২৬ সালে জিডিপির প্রায় ৮.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা উন্নয়ন ব্যয়কে আরও চাপের মধ্যে ফেলছে।
বিশেষ করে জ্বালানি, গ্যাস ও সারের মতো খাতে ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাড়ায় উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। এতে অবকাঠামো, শিক্ষা ও বিদ্যুৎ খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিচালন ব্যয় মূলত তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটায়—যেমন বেতন, সুদ পরিশোধ বা ভর্তুকি। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয় ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে, যেমন সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ। এই ব্যয় কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাম্প্রতিক বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকার এখন পরিচালন ব্যয় মেটাতেও ঋণ নিচ্ছে—যা কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম। ২০২৫ অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় ছিল প্রায় ৪.৬০ ট্রিলিয়ন টাকা, যেখানে রাজস্ব আয় ছিল ৪.৩৬ ট্রিলিয়ন টাকা। ফলে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন টাকার ঘাটতি ঋণ নিয়ে পূরণ করতে হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কয়েকটি বড় ঝুঁকি তৈরি হবে—
- প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া
- কর্মসংস্থান হ্রাস
- দারিদ্র্য কমানোর গতি ধীর হওয়া
- বেসরকারি বিনিয়োগে চাপ
- মূল্যস্ফীতি বাড়ার সম্ভাবনা
দেশে কর আদায় দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার ৭ শতাংশের নিচে নেমে যায়। যদিও ২০২৬ সালে তা ৭.৮ শতাংশে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবুও এটি প্রয়োজনের তুলনায় কম।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ক্রমেই ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করছে। এর ফলে ২০২৫ সালে সরকারি ঋণ জিডিপির ৩৯.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৮ সালের মধ্যে তা ৪৫ শতাংশ ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত আর্থিক সংস্কার জরুরি। এতে দুইটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে—
- ব্যয় যৌক্তিক করা
- রাজস্ব আদায় বাড়ানো
অর্থনীতিবিদদের মতে, এক থেকে দুই বছরের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো না গেলে অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি হতে পারে। এতে বিনিয়োগ কমবে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে এবং দারিদ্র্য কমানোর অগ্রগতি থমকে যেতে পারে। তবে তারা মনে করেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। এজন্য কর ব্যবস্থার সংস্কার, বিকল্প অর্থায়ন উৎস খোঁজা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিতে হবে। সার্বিকভাবে, উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়া শুধু একটি বাজেট সমস্যা নয়—এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

