বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং একসময় আস্থা, নৈতিকতা ও বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সুদবিহীন লেনদেন, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের ধারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিশ্বাস ও নিরাপত্তাবোধ তৈরি করেছিল। ফলে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এই ব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং ইসলামী ব্যাংকিং ধীরে ধীরে একটি নির্ভরযোগ্য আর্থিক কাঠামোতে পরিণত হয়।
তবে সময়ের ব্যবধানে এই আস্থার ভিত নড়বড়ে হয়ে ওঠে। নানা অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন, ঋণ কেলেঙ্কারি ও তারল্য সংকট পুরো ব্যাংক খাতকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। যে খাত একসময় বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই ধীরে ধীরে আস্থাহীনতার ছায়া নেমে আসে। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রভাব ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে পরিচালিত কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অতিরিক্ত প্রভাব ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার প্রভাব পড়ে আমানতকারী থেকে শুরু করে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতিতে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলের পর ব্যাংক খাতে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করা এবং গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠন করা। এর ফলে ধীরে ধীরে আস্থা ফিরে আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে শরিয়াহ ব্যাংকিং এখন আর শুধু একটি আর্থিক ব্যবস্থার নাম নয়; এটি গ্রাহকের বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং নৈতিক প্রত্যাশার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি ক্ষেত্র। তাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সংকট পেরিয়ে এই খাত কতটা টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এবং আবারও কি আগের মতো গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক ধরনের নীরব সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গ্রাহকের আস্থাহীনতা এবং প্রতিদিনের বাস্তব ভোগান্তি। একসময় যে খাত নৈতিকতা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো, আজ সেখানে অনেক গ্রাহক তাদের নিজস্ব আমানতের নিরাপত্তা নিয়েই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
এই সংকটের বড় একটি কারণ হলো তারল্য ঘাটতি। কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে অর্থসংকটে ভুগছে, যার ফলে গ্রাহকরা প্রয়োজনের সময় নিজেদের জমাকৃত অর্থ তুলতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে সীমিত পরিমাণে টাকা উত্তোলনের বিধিনিষেধ কিংবা দীর্ঘ সময় অপেক্ষার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
এর পাশাপাশি শরিয়াহ নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগও ক্রমেই জোরালো হয়েছে। অনেক ব্যাংকে শরিয়াহ সুপারভিশন ব্যবস্থা দুর্বল, অডিট কার্যক্রম অকার্যকর এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে যে ব্যাংকগুলো শরিয়াহসম্মত লেনদেনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করেছিল, সেগুলোর কার্যক্রম অনেক সময় প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে খুব একটা পার্থক্য রাখছে না—এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণে অনিয়ম, তথ্য গোপন এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া বিনিয়োগের কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্ক এই আস্থাহীনতাকে আরও গভীর করেছে। ফলে সাধারণ আমানতকারীরা মনে করছেন, তাদের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবস্থাপিত হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে সুশাসনের অভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি এই খাতে গ্রাহক ভোগান্তিকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে। যে আস্থার ভিত্তিতে শরিয়াহ ব্যাংকিং গড়ে উঠেছিল, সেই ভিত্তিই আজ সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে। এই বাস্তবতা শুধু একটি আর্থিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয় না; বরং এটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাসের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং মূলত একটি নৈতিক ও বিশ্বাসনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থা, যার ভিত্তি গড়ে উঠেছে সুদবিহীন লেনদেন, স্বচ্ছতা এবং শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের ওপর। এই ব্যবস্থায় সুদ (রিবা), অনিশ্চয়তাপূর্ণ লেনদেন (গারার) এবং হারাম খাতে বিনিয়োগ পরিহার করা হয়, যা ধর্মপ্রাণ গ্রাহকদের কাছে একে গ্রহণযোগ্য ও আস্থার জায়গায় নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে মুদারাবা ও মুশারাকাহর মতো লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বভিত্তিক বিনিয়োগ পদ্ধতি গ্রাহকদের সঙ্গে একটি অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক তৈরি করে, যেখানে লাভ হলে তা ন্যায্যভাবে বণ্টন করা হয়—এটিও আস্থা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তবে কেবল নীতিগত কাঠামোই নয়, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সুশাসন ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরিয়াহ বোর্ডের স্বাধীন ও কার্যকর ভূমিকা, বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছ প্রকাশ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি—এসব বিষয় সরাসরি গ্রাহকের বিশ্বাসকে প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক শরিয়াহ গভর্ন্যান্স জোরদার, বোর্ড সদস্যদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম কমাতে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা আস্থা পুনর্গঠনের পথে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে, গত কয়েক বছরের আর্থিক অনিয়ম, তথ্য গোপন, দুর্বল তদারকি এবং তারল্য সংকট এই খাতে আস্থার ঘাটতি তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকরা তাদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, এমনকি কেউ কেউ প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী উইন্ডোর দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। বিশেষ করে কয়েকটি ব্যাংকের দুরবস্থা এবং মুনাফা কমে যাওয়াও এই আস্থাহীনতাকে আরও বাড়িয়েছে।
বর্তমানে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, তারল্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সেবা নিশ্চিত করা। ডিজিটাল ব্যাংকিং, দ্রুত গ্রাহকসেবা এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারলে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা পুনরুদ্ধার সহজ হবে। পাশাপাশি নৈতিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং শরিয়াহ নীতিমালার কঠোর অনুসরণ ব্যাংকগুলোর গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শরিয়াহ ব্যাংকিং কেবল একটি ব্যবসায়িক কাঠামো নয়; এটি আস্থা, নৈতিকতা এবং দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি আর্থিক ব্যবস্থা। সঠিক সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারলে এই খাত আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরে আসতে পারে এবং বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি টেকসই ও বিশ্বাসযোগ্য স্তম্ভ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং খাতে সৃষ্ট আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু কঠোর ও কাঠামোগত সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংকিং পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে একীভূতকরণ নীতি সামনে আনা হয়েছে, যেখানে আর্থিকভাবে দুর্বল কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী কাঠামোর অধীনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকগুলোর মূলধন শক্তিশালী করা, তারল্য সংকট মোকাবিলা করা এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখা। এই ধরনের ‘বেইল-ইন’ ভিত্তিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে।
একই সঙ্গে শরিয়াহ গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক শরিয়াহ বোর্ডগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যাতে এসব বোর্ড পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারে। কারণ অতীতে দুর্বল তদারকি এবং শরিয়াহ নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করার ফলে অনেক অনিয়ম ও অর্থপাচারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। নতুন কাঠামোর আওতায় শরিয়াহ সুপারভিশনকে আরও জোরদার করা এবং প্রতিটি ব্যাংকে স্বতন্ত্র তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ, পৃথক কমপ্লায়েন্স বিভাগ গঠন এবং একটি সমন্বিত সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং খাতকে ঘিরে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে এখন একটি সুসংগঠিত সংস্কার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। তবে এই উদ্যোগগুলোর সাফল্য নির্ভর করবে কতটা কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়ন করা যায় এবং কত দ্রুত গ্রাহকদের কাছে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন পৌঁছানো সম্ভব হয় তার ওপর।
সাম্প্রতিক সময়ের নানা সংকট ও অস্থিরতার পরও বাংলাদেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং খাতে ধীরে ধীরে আস্থা ফেরার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের শেষ দিকে আমানত ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা এই খাতের পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৫.২ শতাংশ। সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এই বৃদ্ধি গ্রাহকদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসার প্রতিফলন।
শুধু আমানত নয়, বিনিয়োগ ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৩৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা এক বছরের ব্যবধানে বেড়ে ২০২৫ সালের শেষে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৪১ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা প্রায় ৯.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। একইভাবে পুরো ব্যাংকিং খাতের ঋণ ও বিনিয়োগের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এই খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ দেয়।
এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস এবং দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারকারী কিছু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ। এর ফলে আর্থিক অনিয়ম হ্রাসের একটি বার্তা বাজারে পৌঁছায় এবং আমানতকারীদের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পাশাপাশি পূর্বে সংঘটিত বড় আর্থিক অনিয়ম ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও হিসাব জব্দের মতো পদক্ষেপ গ্রাহকদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়িয়েছে।
তবে এই অগ্রগতির মধ্যেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কয়েকটি ব্যাংকে এখনও উচ্চ খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং মুনাফা হ্রাসের সমস্যা বিদ্যমান। কোথাও কোথাও গ্রাহকদের প্রত্যাশিত মুনাফা না পাওয়া বা সীমিত পরিসরে ‘হেয়ারকাট’ দেওয়ার ঘটনাও আস্থাকে পুরোপুরি স্থিতিশীল হতে দিচ্ছে না। তবুও সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সংকট কাটিয়ে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং খাত ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে অগ্রসর হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, আমানত ও বিনিয়োগের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানগত অগ্রগতি নয়; এটি গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যদি চলমান সংস্কার, সুশাসন ও কার্যকর তদারকি অব্যাহত থাকে, তবে এই খাত ভবিষ্যতে আরও স্থিতিশীল ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে অতীতের অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের প্রভাব, অন্যদিকে চলমান সংস্কার ও নিয়ন্ত্রক তৎপরতার ফলে ধীরে ধীরে আস্থা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমানত ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রবণতা এ খাতের পুনরুদ্ধারের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে।
তবে এই অগ্রগতি টেকসই করতে হলে কেবল সাময়িক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর জবাবদিহিতা। একই সঙ্গে শরিয়াহ নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন, আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, শরিয়াহ ব্যাংকিং শুধু একটি আর্থিক ব্যবস্থা নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস ও নৈতিক প্রত্যাশার প্রতিফলন। সেই বিশ্বাস পুনরুদ্ধার যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি তা ধরে রাখা আরও চ্যালেঞ্জিং। তাই ধারাবাহিক সংস্কার ও শক্তিশালী তদারকির মাধ্যমে এই খাতকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারলে এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি টেকসই ও আস্থাভিত্তিক স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সক্ষম হবে।

