ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগে বড় সংকটে পড়েছেন দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের একাধিক উদ্যোক্তা। তাদের দাবি, ব্যাংকের ভেতরের দুর্নীতি ও দুর্বল তদারকির দায় অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ব্যবসায়ীদের ওপর। এতে কারখানা বন্ধের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি।
এমন প্রেক্ষাপটে নারায়ণগঞ্জের ২৬টি রপ্তানিমুখী গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে যৌথ আবেদন করেছেন। তারা পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছেন।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, একটি বেসরকারি ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার কিছু কর্মকর্তা ভুয়া রপ্তানি চুক্তি ও জাল ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি তৈরি করে হাজার কোটি টাকার অনিয়ম করেছেন। পরে সেই দায় উল্টো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে তাদের অজ্ঞাতেই ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ঋণ দেখানো হয়েছে। এমনকি অনুমতি ছাড়াই এলসি খোলা এবং লেনদেন সম্পন্ন করা হয়েছে।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে, ভুয়া রপ্তানির আড়ালে ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৮১ কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যাংকের শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।তদন্তে আরও দেখা গেছে, রপ্তানির তুলনায় অস্বাভাবিক হারে কাঁচামাল আমদানির তথ্য দেখানো হয়েছে। অথচ বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত রপ্তানি কার্যক্রম ছিল না। এমনকি স্থানীয় বাজার থেকে কেনা পণ্যকে বিদেশি আমদানি হিসেবে দেখিয়ে এলসি সমন্বয় করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত রপ্তানি আয় ছাড়াই ঋণের অর্থ ডলারে রূপান্তর করে এলসি দায় সমন্বয় করা হয়েছে। ব্যাংকের সফটওয়্যার ব্যবস্থার দুর্বলতা ব্যবহার করে ভুয়া আইডি ও কাগুজে বিল তৈরি করে এসব লেনদেন সম্পন্ন করা হয়। এছাড়া পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদিত সীমার বাইরে গিয়ে একাধিক ঋণ বিতরণের ঘটনাও সামনে এসেছে, যা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বড় ধরনের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
ভুক্তভোগী উদ্যোক্তাদের দাবি, তাদের অজ্ঞাতে ‘ফোর্সড লোন’ ও ‘ডিমান্ড লোন’ তৈরি করা হয়েছে। পরে এসব ঋণের ওপর উচ্চ সুদ আরোপ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে কোনও পূর্ব নোটিশ ছাড়াই এসব দায় চাপানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, চলতি হিসাব থেকে টাকা কেটে ডলার কেনা হয়েছে এবং বিদেশে পরিশোধ দেখানো হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা আইন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার পরিপন্থি।
কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বারবার পূর্ণাঙ্গ হিসাব বিবরণী চাইলেও তা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো ফাঁকা চেক ব্যবহার করে ঋণ আদায়ে মামলা করা হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের ওপর ঋণ পুনঃতফসিল নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। শর্ত না মানলে ঋণসুবিধা বন্ধ, এলসি বাতিল ও প্যাকিং ক্রেডিট সীমা প্রত্যাহারের হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, প্যাকিং ক্রেডিট বন্ধ হলে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া সম্ভব হয় না, ফলে কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের দাবি করা ঋণ মেনে না নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে। অন্যদিকে যারা বাধ্য হয়ে ঋণ স্বীকার করেছে, তাদের ক্ষেত্রে ঋণ পুনঃতফসিল করা হলেও পরে তা বাতিল হয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে।
উদ্যোক্তারা দাবি করেছেন, ব্যাংকের চাপ ও আর্থিক সংকটে পড়ে অন্তত তিনজন গার্মেন্ট মালিক মারা গেছেন। তাদের মতে, অতিরিক্ত চাপ, মামলা ও ঋণের বোঝা এই মৃত্যুগুলোর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
খাত সংশ্লিষ্ট সংগঠন থেকে বলা হয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নিলাম বন্ধ রাখা উচিত। অন্যথায় তা অন্যায্য হবে এবং রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
উদ্যোক্তাদের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ২৬টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত। কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন এবং দেশের রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে কয়েকটি দাবি জানিয়েছেন—
- আরোপিত ঋণের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত
- প্রকৃত দায় নির্ধারণ
- এককালীন সমাধানের সুযোগ
- ব্যবসা চালিয়ে যেতে সহায়তা
উদ্যোক্তাদের মতে, কারখানা সচল রাখাই সমস্যার টেকসই সমাধান। এতে উৎপাদন অব্যাহত থাকবে এবং প্রকৃত দায় পরিশোধও সম্ভব হবে।

