দেশের ব্যাংক খাত সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত নতুন ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’ পাস হওয়ার পরই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। আইনটির একটি বিশেষ ধারা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি সত্যিই সংস্কারের পথ, নাকি অতীতে অনিয়মে জড়িত মালিকদের নতুনভাবে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করছে?
ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা মোকাবিলায় আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং দায়ীদের মালিকানা থেকে সরিয়ে দেওয়া। এই উদ্যোগকে অনেকেই ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার একটি শক্ত পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিলেন।
সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া নতুন আইনে যুক্ত হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা—১৮(ক)। এই ধারার মাধ্যমেই তৈরি হয়েছে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এই বিধান অনুযায়ী, একীভূত বা পুনর্গঠনের আওতায় থাকা ব্যাংকের সাবেক মালিক বা পরিচালকরা তুলনামূলক সহজ শর্তে আবার মালিকানা ফিরে পেতে পারেন।
- মোট দায়ের মাত্র ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ
- বাকি অর্থ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধ
অর্থাৎ, এককালীন পুরো দায় পরিশোধ ছাড়াই কিস্তিতে মালিকানা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগের অধ্যাদেশে যেখানে দায়ীদের জন্য কঠোর অবস্থান ছিল, সেখানে নতুন আইনে এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। ফলে যারা অতীতে ব্যাংক খাতের অনিয়মে জড়িত ছিলেন, তারাই আবার মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এতে করে সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বড় ঝুঁকির কথা তুলে ধরছেন—যারা ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়েছেন বা অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত, তারা পুনরায় দায়িত্ব পেলে আগের সমস্যাগুলো ফিরে আসতে পারে। ব্যাংকের পুরোনো মালিক ফিরে এলে আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে—তাদের অর্থ কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। চলমান ব্যাংক একীভূতকরণ উদ্যোগ এই আইনের কারণে জটিল হয়ে পড়তে পারে, কারণ নতুন করে মালিকানা পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ব্যাংকপাড়ায় আলোচনায় রয়েছে, অতীতে যেসব বড় শিল্পগোষ্ঠী একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে—তাদের জন্য এই আইন সুবিধাজনক হতে পারে। যদিও সরকারিভাবে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবুও সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।
একদিকে ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে অতীতের অনিয়মে জড়িতদের পুনরায় সুযোগ দেওয়া—এই দুই অবস্থানের মধ্যে একটি নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা কঠোর শর্ত, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নইলে এটি ভুল বার্তা দিতে পারে—যে অনিয়ম করলেও শেষ পর্যন্ত ফিরে আসার সুযোগ থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনটির বাস্তব প্রয়োগই নির্ধারণ করবে এটি সংস্কারের হাতিয়ার হবে, নাকি বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাদের মতে,
- কঠোর নজরদারি
- স্বচ্ছ যাচাই প্রক্রিয়া
- এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা
এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা না গেলে ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সব মিলিয়ে, নতুন এই আইন ব্যাংক খাতে একদিকে সম্ভাবনার দরজা খুলেছে, অন্যদিকে তৈরি করেছে নতুন প্রশ্ন—সংস্কারের নামে কি আবারও পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটবে?

