ব্যাংক খাত সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত নতুন আইনে শেষ মুহূর্তে যুক্ত একটি ধারা এখন পুরো আর্থিক খাতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’-এর ১৮(ক) ধারা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক—কারণ এর মাধ্যমে অতীতে অনিয়মে জড়িত মালিকদের আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি আইনি সংযোজন নয়; বরং ব্যাংক খাতে অতীতের অনিয়ম ও লুটপাটে জড়িতদের জন্য “ফিরে আসার পথ” তৈরি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইনটির মূল খসড়ায় ১৮(ক) ধারা ছিল না। সংসদে বিল উপস্থাপনের ঠিক আগে, ৯ এপ্রিল রাতে এটি নতুন করে সংযোজন করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সংযোজনের প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কার্যত পাশ কাটানো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি জানার পর তারা দ্রুত অর্থ মন্ত্রণালয়কে এই ধারা অন্তর্ভুক্ত না করার অনুরোধ করেছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, এই বিধান পুরো সংস্কার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে দেবে। একজন কর্মকর্তা বলেন, যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কারণে ব্যাংকগুলো ধ্বংসের মুখে পড়েছে, তাদের জন্য এত সহজে ফিরে আসার সুযোগ দিলে সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
আইনটি চূড়ান্ত করার আগে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন বিভাগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধিরা ছিলেন। তারা খসড়া আইনের বেশ কিছু ধারা সংশোধন ও সরলীকরণের প্রস্তাব দেন। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি ওই কমিটির চূড়ান্ত খসড়ায় ছিল না। বরং অধিকাংশ সদস্য এ ধরনের বিধানের বিরোধিতা করেছিলেন। তারপরও শেষ মুহূর্তে এটি যুক্ত হওয়ায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
এই ধারার অধীনে, একীভূত বা পুনর্গঠনের আওতায় থাকা ব্যাংকের সাবেক শেয়ারহোল্ডাররা চাইলে আবার মালিকানা ফিরে পাওয়ার আবেদন করতে পারবেন। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—
- মোট দায়ের মাত্র ৭.৫ শতাংশ পরিশোধ করলেই মালিকানা ফেরার প্রক্রিয়া শুরু
- বাকি অর্থ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধের সুযোগ
অর্থাৎ, পুরো অর্থ একবারে না দিয়েও ধাপে ধাপে পরিশোধের মাধ্যমে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া সম্ভব।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই শর্ত বাস্তবে খুবই সহজ। যারা অতীতে হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন, তাদের জন্য ৭.৫ শতাংশ অর্থ জোগাড় করা কঠিন নয়। ফলে তারা দ্রুতই আবার মালিকানায় ফিরতে পারেন। এতে কয়েকটি বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে— সংস্কার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যেতে পারে। যাদের কারণে ব্যাংক দুর্বল হয়েছে, তারাই আবার দায়িত্ব পেলে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থাকে। আমানতকারীদের আস্থা সংকটে পড়তে পারে। ব্যাংকের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি বাংলাদেশ ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে ‘ফেরার দরজা’ খুলল বিতর্কিত ১৮ক ধারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। নীতিনির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পাশ কাটানোর ঘটনা ভবিষ্যৎ আর্থিক শাসনব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা এই ধারা যুক্ত করতেই হলে কিছু কঠোর শর্ত রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যেমন—
- সম্পূর্ণ দেনা পরিশোধ ছাড়া মালিকানা না দেওয়া
- অনিয়মে জড়িতদের স্থায়ীভাবে মালিকানা থেকে বাদ দেওয়া
- আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাধ্যবাধকতা
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব শর্ত আইনে প্রতিফলিত হয়নি। আইনটি নিয়ে আলোচনায় রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া। এসব ব্যাংকের অতীত ব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগ থাকায় নতুন আইনের এই ধারা নিয়ে আরও বেশি প্রশ্ন উঠছে।
আইনের অন্যান্য ধারায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে—প্রশাসক নিয়োগ, সম্পদ হস্তান্তর, ব্রিজ ব্যাংক গঠন বা প্রয়োজনে বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে ১৮(ক) ধারা পুরো কাঠামোর ওপর ছায়া ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সংস্কারের মূল লক্ষ্য যদি হয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, তাহলে এই ধারা বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি ও স্পষ্ট শর্ত আরোপ না করলে ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

