দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন এক বড় পরিবর্তনের দ্বার খুলতে যাচ্ছে। পাকিস্তানভিত্তিক ব্যাংক আল-ফালাহর বাংলাদেশে পরিচালিত কার্যক্রম—অর্থাৎ সম্পদ ও দায়—অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংক এশিয়া। শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের পর এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড় পেলেই চূড়ান্ত হবে এই লেনদেন।
বাংলাদেশের অন্যতম বেসরকারি ব্যাংক ব্যাংক এশিয়া, বিদেশি ব্যাংকের স্থানীয় কার্যক্রম অধিগ্রহণের ধারাবাহিকতায় এবার নতুন আরেকটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। পাকিস্তানের শীর্ষ বাণিজ্যিক ব্যাংক আল-ফালাহর বাংলাদেশ অংশের সম্পদ ও দায় কিনে নেওয়ার প্রস্তাব ইতোমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি ৭৫ লাখ মার্কিন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৮৪ কোটি টাকা) একটি লেনদেন প্রস্তাব শেয়ারহোল্ডাররা বিশেষ সাধারণ সভায় অনুমোদন দিয়েছেন। তবে এই মূল্য চূড়ান্ত নয়—একীভূতকরণের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী এতে পরিবর্তন আসতে পারে।
এই অধিগ্রহণ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনুমোদন প্রয়োজন। ব্যাংক এশিয়া জানিয়েছে, সব প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির আশা, আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হবে।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, আল-ফালাহর বাংলাদেশ কার্যক্রম ছিল লাভজনক। ওই বছরে কর-পূর্ব মুনাফা দাঁড়ায় প্রায় ২৯ কোটি টাকার বেশি। ব্যাংকটির বাংলাদেশে মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে ছিল—নিয়মিত ঋণ, বিভিন্ন বিনিয়োগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দেওয়া ঋণ, নগদ অর্থ ও ব্যাংকে জমা ও অন্যান্য সম্পদ।
খেলাপি ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল, যা কার্যক্রমের স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে আমানত, ঋণ ও অন্যান্য দায় মিলিয়ে মোট দায়ও ছিল বড় আকারের। সবকিছু হিসাব করে নিট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় কয়েকশ কোটি টাকার সমান।
বর্তমানে বাংলাদেশে আল-ফালাহর ৭টি শাখায় ১৬১ জন কর্মী কাজ করছেন। ব্যাংক এশিয়া জানিয়েছে, এই কর্মীদের ধরে রাখার পরিকল্পনাই রয়েছে। তবে একই এলাকায় দুই ব্যাংকের শাখা থাকলে কিছু শাখা স্থানান্তর করা হতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতার মতোই কোনো বড় ধরনের ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা নেই বলে জানানো হয়েছে।
ব্যাংক এশিয়ার জন্য এটি শুধু একটি অধিগ্রহণ নয়, বরং একটি কৌশলগত সম্প্রসারণ। এর মাধ্যমে তারা—আন্তর্জাতিক মানের সেবা বাড়াতে চায়, ঋণ কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে চায় ও নতুন গ্রাহক ও বাজার যুক্ত করতে চায়। এতে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিদেশি ব্যাংকের স্থানীয় কার্যক্রম অধিগ্রহণে ব্যাংক এশিয়ার অভিজ্ঞতা নতুন নয়। এর আগে তারা কানাডার একটি ব্যাংক এবং পাকিস্তানের আরেকটি ব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যক্রম নিজেদের অধীনে নিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা বর্তমান প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে সহায়ক হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক সময় শ্রীলঙ্কার একটি ব্যাংকও এই কার্যক্রম কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। এমনকি প্রাথমিক মূল্যায়নের অনুমোদনও পেয়েছিল। কিন্তু পরে তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায়। এর ফলে ব্যাংক এশিয়ার জন্য সুযোগ তৈরি হয়।
আল-ফালাহ শুধু পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের কার্যক্রম রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাংকটির সম্পদ, আমানত ও ঋণ বিতরণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা কিছু দেশে কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করছে, যার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অধিগ্রহণ কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ— বাজারে একীকরণ বাড়বে। ছোট বা বিদেশি ব্যাংকের কার্যক্রম বড় স্থানীয় ব্যাংকের অধীনে এলে খাতটি আরও সংহত হবে। দক্ষতা ও প্রতিযোগিতা বাড়বে। একীভূতকরণের ফলে পরিচালন ব্যয় কমে এবং সেবার মান উন্নত হতে পারে। গ্রাহক সুবিধা বাড়ার সম্ভাবনা। গ্রাহকরা বৃহত্তর নেটওয়ার্ক ও উন্নত প্রযুক্তিগত সেবা পেতে পারেন। নিয়ন্ত্রক নজরদারি সহজ হবে। কম সংখ্যক কিন্তু শক্তিশালী ব্যাংক থাকলে তদারকি কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ব্যাংক এশিয়ার এই উদ্যোগ শুধু একটি করপোরেট লেনদেন নয়—এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন নজর রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের দিকে। অনুমোদন মিললেই দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে আরেকটি বড় একীভূতকরণ যুক্ত হবে।

