দেশের বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক চিত্র নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রকাশ্যে মুনাফা দেখানো হলেও বাস্তবে ব্যাংকটি বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতিতে রয়েছে—এমনই দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের। তাদের মতে, লুকানো বা সমন্বয়হীন লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক হিসাব ও প্রকৃত অবস্থার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ব্যাংকটি কাগজে-কলমে মুনাফা দেখালেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তা লোকসানে পরিণত হয়েছে।সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগ পর্যন্ত ব্যাংকটি ধারাবাহিকভাবে মুনাফায় থাকলেও পরবর্তীতে আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত হিসাব করা মুনাফা প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলন নয় বলে দাবি করা হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, খেলাপি বিনিয়োগে আরোপিত ক্ষতিপূরণ সাধারণভাবে সরাসরি মুনাফা হিসেবে গণ্য করা যায় না। শরিয়াহভিত্তিক নীতিমালায় এই অর্থ জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, ইসলামী ব্যাংক কিছু ক্ষেত্রে আদায়যোগ্য এবং অনাদায়যোগ্য ক্ষতিপূরণকেও মুনাফার খাতে যুক্ত করছে। এতে প্রকৃত আর্থিক ফলাফল আড়াল হয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
একজন অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, খেলাপি বিনিয়োগ থেকে সৃষ্ট ক্ষতিপূরণের অর্থ হিসাবের ভেতর মুনাফা হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তার দাবি অনুযায়ী, এই অঙ্কই প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি, যা প্রকৃতপক্ষে সম্ভাব্য ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
অভিযোগ অনুযায়ী, শুধু আদায় হওয়া অর্থ নয়, বরং ভবিষ্যতে আদায়যোগ্য ক্ষতিপূরণও মুনাফার খাতে দেখানো হচ্ছে। এতে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর চিত্র তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। এ বিষয়ে আরেকটি সূত্রের ভাষ্য, লোকসান আড়াল করলে আমানতকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই এমন হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে বলে অনানুষ্ঠানিকভাবে যুক্তি দেওয়া হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত বিনিয়োগের হার নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে আনুষ্ঠানিক হিসাবে একটি নির্দিষ্ট হার দেখানো হলেও, অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে খেলাপির প্রকৃত হার অনেক বেশি—এমন দাবি উঠেছে। সূত্রগুলো বলছে, কয়েক বছর আগেও খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে বড় ঋণগ্রহীতাদের কার্যক্রম বন্ধ হওয়া এবং নতুন করে ঋণ আদায়ে ধীরগতিকে দায়ী করা হচ্ছে।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, ব্যাংক পরিচালনায় পেশাদারিত্বের ঘাটতি রয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রশাসনিক দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। তাদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংক পরিচালনা কাঠামো রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে পরিচালিত হয়েছে, যার ফলে ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নিরীক্ষা আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের। একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, যদি অনিয়ম বা তথ্য গোপনের বিষয় সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে বিশেষ নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র বের করা হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও আস্থাই মূল ভিত্তি। আর্থিক তথ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পড়ে। তাদের মতে, যদি প্রকৃত লোকসান ও খেলাপি পরিস্থিতি প্রকাশ্যে আসে, তবে আমানত প্রবাহ ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক চিত্র নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মুনাফা বনাম প্রকৃত লোকসানের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন যেমন বাড়ছে, তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারির দাবিও জোরালো হচ্ছে। এখন নজর থাকবে আনুষ্ঠানিক নিরীক্ষা ও ভবিষ্যৎ আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর—যা প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করতে পারে।

