বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন এক গভীর কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং সরকারি ঋণের চাপ বেসরকারি বিনিয়োগকে সংকুচিত করছে—এমন বাস্তবতায় দ্রুত ও সমন্বিত সংস্কার ছাড়া বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে দেশ।
বাংলাদেশের আর্থিক খাত বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, যেখানে একাধিক দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা একসঙ্গে চাপ সৃষ্টি করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ব্যাংকগুলোর উচ্চ মাত্রার খেলাপি ঋণ, মূলধনের ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ—যা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি, যা সম্পদ ব্যবস্থাপনার দুর্বল চিত্র তুলে ধরে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালেই ব্যাংক খাতে ঋণ ক্ষতির জন্য প্রয়োজনীয় সংরক্ষিত অর্থে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়, যার পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন টাকারও বেশি। বিশ্বব্যাংকের একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের জন্য দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত মূলধন প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এই ঋণ তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে এসেছে, যা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট সমাধানে কেবল নীতি নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছাসহ সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। তারা ব্যাংকিং খাতে কয়েকটি বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন—
খেলাপি ঋণ ও পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন টাস্কফোর্স গঠনের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক সম্পদ অনুসন্ধান ব্যবস্থাও চালুর সুপারিশ রয়েছে। ভূমি, সম্পদ, যন্ত্রপাতি ও শেয়ারের জন্য একটি একক ডিজিটাল রেজিস্ট্রি তৈরি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে একাধিকবার একই সম্পদ বন্ধক রাখার প্রবণতা বন্ধ হয়।
সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর জন্য শেয়ারহোল্ডার ও বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে মূলধন জোগাড়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারি সহায়তা কেবলমাত্র কঠোর শর্তের ভিত্তিতে সীমিত রাখার সুপারিশ রয়েছ। ব্যাংক খাতে করহার কমিয়ে আন্তর্জাতিক মানে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে ব্যাংকগুলো বেশি ঋণ দিতে সক্ষম হয় এবং মূলধন শক্তিশালী হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য বিশেষ ঋণ ও ভর্তুকি কাঠামো তৈরির কথা বলা হয়েছে, যা সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে মোট ঋণের ৩০ শতাংশের নিচে নামানো জরুরি। তা না হলে বেসরকারি খাত আরও সংকুচিত হবে। কর আদায় বাড়াতে ব্যাংকিং অবকাঠামোর সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থার ডিজিটাল সংযোগের প্রস্তাব এসেছে। পাশাপাশি ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংকের মধ্যে পূর্ণ আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে লেনদেন সহজ হবে এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান দুর্বলতা শুধু আর্থিক নয়, এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট থাকলে বিনিয়োগ কমে যায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হয়।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত সংস্কার না হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষায়, এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এর ব্যয় আরও বড় আকারে বহন করতে হবে অর্থনীতিকে।

