দেশের ব্যাংকিং খাতে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যে নতুন এক সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান। সংকটে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সাবেক মালিকদের আবার ব্যাংকিং খাতে ফেরার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিকে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, বিষয়টি কেবল আইনি বা কারিগরি পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সরাসরি ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ও জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২৫ সালের মে মাসে জারি করা এক অধ্যাদেশে সংকটে থাকা ব্যাংকের সাবেক মালিকদের যেকোনো ধরনের সম্পৃক্ততা থেকে দূরে রাখার বিধান ছিল। তবে নতুন প্রণীত ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’-এ সেই অবস্থান থেকে সরে এসে অর্থের বিনিময়ে তাদের আবার নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সেলিম রায়হানের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলে ৩৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু সাবেক মালিকরা মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ আগাম দিয়ে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। বাকি অর্থ দুই বছরের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ থাকবে।
এ প্রেক্ষাপটে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই কাঠামো রাষ্ট্রীয় উদ্ধার উদ্যোগকে বেসরকারি পুনর্বাসনে রূপ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। অর্থাৎ সংকটের দায় রাষ্ট্র নিলেও, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই আবার সুবিধাভোগী হয়ে উঠতে পারেন।
তার মতে, এতে একটি নৈতিক ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। অতীতে যেসব মালিকের বিরুদ্ধে ঋণ অনিয়ম, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পাশ কাটানো এবং আমানতকারীদের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, তারা সহজ শর্তে ফিরে এলে পুরো খাতে নেতিবাচক বার্তা যাবে।
তিনি বলেন, এতে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা ধারণা পেতে পারেন যে অনিয়মের পরও শেষ পর্যন্ত সমঝোতার মাধ্যমে বৈধতা পাওয়া সম্ভব। এর ফলে সৎ ব্যাংকাররা নিরুৎসাহিত হবেন এবং আমানতকারীদের আস্থা আরও দুর্বল হবে।
সেলিম রায়হান তার স্ট্যাটাসে আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যাংকিং খাত উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর প্রভাব বিস্তারের সমস্যায় ভুগছে। বোর্ড পুনর্গঠন, একীভূতকরণ এবং সাবেক মালিকদের বাইরে রাখার মাধ্যমে যে সংস্কার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, নতুন আইনি কাঠামো সেটিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
তিনি আরও বলেন, আইনে মূলধন সংযোজন, যাচাই-বাছাই, পাওনাদার নিষ্পত্তি ও তদারকির মতো কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে এগুলোর কার্যকারিতা পুরোপুরি নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
শেষে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আইনটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এমন কোনো সুযোগ রাখা উচিত নয়, যার মাধ্যমে ব্যর্থ বা অনিয়মে জড়িত সাবেক মালিকরা সহজেই আবার মালিকানা ফিরে পান।
তার মতে, ব্যাংকিং খাতের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আস্থা পুনর্গঠন। জনগণের আস্থা তখনই ফিরবে, যখন তারা দেখবেন অর্থনৈতিক অপরাধের শাস্তি হচ্ছে, আমানত সুরক্ষিত থাকছে এবং কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য সংস্কার প্রক্রিয়া দুর্বল করা হচ্ছে না।

