আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার নজিরবিহীন ব্যাংক লুটপাটের ক্ষত ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। বেশির ভাগ ঋণ ধীরে ধীরে খেলাপি হয়ে উঠছে। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে বেপরোয়া গতিতে। একই সঙ্গে বাড়ছে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি। কমে যাচ্ছে আয়যোগ্য সম্পদ। এর প্রভাব পড়ছে সার্বিক আয়ের প্রবণতায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, খেলাপি ঋণের লাগামহীন উর্ধ্বগতি সব সূচকে আগ্রাসী আঘাত তৈরি করছে। ব্যাংক খাত এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। তারা মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে এর খেসারত দিতে হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। বর্তমান পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য এক ধরনের অশনিসংকেত। বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের পক্ষে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে। দুই সূচকে ভালো করতে না পারলে সরকারের সফলতা সীমিত হবে। আর ব্যাংকে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে সংকট আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। হিসাবের মধ্যে ঋণ অবলোপন, নবায়ন ও আদালতে আটকে থাকা ঋণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তিনি বলেন, প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ খেলাপিকে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার করতে হবে। তা না হলে দেশ ব্যাংক খাতের সংকট থেকে বের হতে পারবে না।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, কর্মসংস্থান বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে কর্মসংস্থানও বাড়বে না। বিনিয়োগের জন্য বিপুল টাকার প্রয়োজন, কিন্তু সেই অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। তাই বেশির ভাগ ব্যাংকের অবস্থা এখন নাজুক। তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগের জন্য টাকা কোথা থেকে আনা যাবে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে মোট ব্যাংকের অর্ধেকই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। খেলাপি ঋণের ফাঁদে পড়ে এই ব্যাংকগুলো এক রকম পঙ্গু হয়ে গেছে। তাদের মূল সমস্যা দুটি: এক, আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া; দুই, আস্থাহীনতার কারণে নতুন আমানতকারী পাওয়া যায় না। ফলে এসব ব্যাংক দেশের বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতে কার্যকর অবদান রাখতে পারছে না।
অবশিষ্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে কিছু এখনও সবল থাকলেও বেশির ভাগ ব্যাংকের অবস্থা মধ্যম মানের। ফলে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে পরিমাণ বিনিয়োগের চাহিদা তৈরি হবে, তার জন্য পর্যাপ্ত পুঁজি ব্যাংকে নেই। বিনিয়োগের আরেকটি বড় বাধা হলো উচ্চ সুদ। বর্তমানে ঋণের সুদের হার ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এই হারে ঋণ নিয়ে কেউ ব্যবসা করার সাহস দেখাবে না।
বর্তমানে দুর্বল ব্যাংকগুলোর হাহাকার অবস্থা আমানত সংগ্রহেও দেখা যাচ্ছে। সক্ষমতা কম থাকলেও এই ব্যাংকগুলো ১৩-১৪ শতাংশ সুদে আমানত নিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে এটি আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। কারণ উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়া ব্যাংকগুলোও এক সময় খেলাপি হয়ে যাবে। ফলে ব্যাংক খাতের এই নানামুখী ভুলের ঝুঁকি নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
খেলাপি ঋণে রেকর্ড:
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায়, যা বিতরণকৃত ঋণের ৩৫.৭৭ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত এক বছর ৩ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের ৯ মাসে বেড়েছে ২ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকেই সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি হয়েছে।
এছাড়া অবলোপন করা ঋণ, বিশেষ বিবেচনায় নবায়নকৃত ঋণসহ আরও মোটা অঙ্কের ঋণ রয়েছে, যা খেলাপির যোগ্য। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের এই রেকর্ড অঙ্ক দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। সেই তুলনায় বর্তমান খেলাপি ঋণ এখন সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
লাগামহীন খেলাপি ঋণ: ব্যাংক খাত বিপর্যয়ের মুখে:
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে, গত বছরের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১২.৫৬ শতাংশ। ৫ আগস্ট ওই বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতে লুটপাটের তথ্য প্রকাশিত হতে শুরু করে। ফলে খেলাপি ঋণও দ্রুত বাড়তে থাকে।
সরকার পতনের পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকায়। যা মোট ঋণের ১৬.৯৩ শতাংশ। একই বছরের ডিসেম্বরে ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ২০.২০ শতাংশ। লুটপাটের ঋণ খেলাপি হতে শুরু করলে ২০২৫ সালের শুরু থেকে খেলাপি ঋণের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। গত মার্চে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ২৪.১৩ শতাংশ।
গত জুনে খেলাপি ঋণ আরও ভয়ংকর আকার নিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথ্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। এমনকি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্যও হালনাগাদ তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। কারণ বর্ধিত খেলাপি ঋণের তথ্য ব্যবহার করলে ব্যাংক খাতের সার্বিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটত।
প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি বৃদ্ধি:
খেলাপি ঋণের চাপ বেড়ে যাওয়ায় প্রভিশন ঘাটতি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে তা লাখ কোটি টাকার ঘাটতি অতিক্রম করে। জুনে আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায়। সেপ্টেম্বরে কিছুটা কমে তা দাঁড়ায় ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায়। একই সঙ্গে বাড়ছে মূলধন ঘাটতি। ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান কমছে, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ বাড়ছে। এর ফলে আয়ও কমছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তত ৫০-৬০ শতাংশ ব্যাংক বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

