দেশের ব্যাংকিং খাত যখন ইতিহাসের এক কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নতুন ও আলোচিত নীতিমালা জারি করেছে। এই নীতিমালা অনুযায়ী এখন থেকে আর্থিক খাতের প্রধান তিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা—বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি এবং আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক (ইডি) বা সমমানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
এ জন্য প্রার্থীকে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় অন্তত ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং জাতীয় বেতন কাঠামোর দ্বিতীয় গ্রেডে থাকতে হবে। নীতিমালার পক্ষসমর্থকদের দাবি, অভিজ্ঞ জনবলের সংকট মোকাবিলায় এটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে আর্থিক বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের বাণিজ্যিক ব্যাংকে সরাসরি নিয়োগ দিলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। এতে ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির প্রয়োজনীয় ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এখন খেলাপি। এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬.৫ লাখ কোটি টাকা। উচ্চ হারে ঋণ অনিয়ম, দুর্বল গভর্ন্যান্স, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের পুঁজি ঘাটতি ব্যাংকিং খাতকে আরও নাজুক করে ফেলেছে। ফলে বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে আর সামগ্রিক অর্থনীতি হয়ে পড়েছে ধীরগতি। এমন পরিস্থিতিতে এমডি নিয়োগের মতো স্পর্শকাতর একটি নীতিগত পরিবর্তন কতটা যৌক্তিক—এ নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।
তবে আরেকটি মত আছে। বলা হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দুই দশকের বেশি সময় কাজ করা কর্মকর্তারা নীতিমালা প্রণয়ন, শৃঙ্খলাবিধান, তদারকি এবং ম্যাক্রোইকোনমিক বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এই অভিজ্ঞতা বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভেতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের কাজের সম্পর্ক থাকায় ঋণ সংস্কারসহ বিভিন্ন নীতিগত ইস্যুতে দ্রুত বোঝাপড়া এবং যোগাযোগের সুবিধাও তৈরি হতে পারে বলে মত দিচ্ছেন অনেকেই।
তবে সমালোচকদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ মূলত নীতি নির্ধারণ, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও তদারকিভিত্তিক। বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডির দায়িত্ব প্রতিদিনের জটিল অপারেশন পরিচালনা। এর মধ্যে রয়েছে গ্রাহকসেবা, করপোরেট ঋণ ব্যবস্থাপনা, ট্রেজারি অপারেশন, শাখা কার্যক্রম এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সামর্থ্য। একজন এমডির দৈনন্দিন কাজের বড় অংশই অপারেশনাল দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসির ইডিরা রেগুলেশন ও পরিদর্শনে দক্ষ হলেও রিটেইল ব্যাংকিং বা শাখা পরিচালনার মতো কাজে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা কম। এই কারণেই মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি বলেছেন, “নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ পদের দায়িত্ব ভিন্ন, চ্যালেঞ্জও আলাদা।” (প্রথম আলো, ২৭ নভেম্বর)
তাই আশঙ্কা রয়েছে যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পেশাজীবীরা নেতৃত্বে এলে অপারেশনাল দক্ষতার ঘাটতি ব্যাংকের কার্যক্রম ধীর করে দিতে পারে। এতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মুনাফা ও প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
এ নীতিমালার সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন স্বার্থের সংঘাতকে। যে সংস্থা কোনো ব্যাংককে তদারক করে, তারই সাবেক বা বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তা যদি সেই ব্যাংকের এমডি হন, তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সাবেক সহকর্মীরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অনিয়ম বা দুর্বলতা তদন্তে নমনীয় আচরণ করতে পারেন—এ আশঙ্কা অমূলক নয়।
এ ছাড়া ব্যাংকের পর্ষদও এমডি নিয়োগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দিতে পারে। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নীতিগত সুবিধা বা লিয়াজোঁর ক্ষেত্রে সাবেক নিয়ন্ত্রকদের বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে অন্যান্য ব্যাংকের জন্য অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং খাতে অনিয়মের সুযোগও বাড়তে পারে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও বলছেন নতুন বিধান কার্যকর হলে ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়োগকারীদের বিশেষ যোগসাজশের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এতে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে সুশাসন নিশ্চিত না করে এবং ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে শুধু এমডি নিয়োগের পুল বাড়িয়ে ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকট কাটানো সম্ভব নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো কর্মকর্তা এমডি হলে তিনি নীতিমালা প্রয়োগে দক্ষতা দেখাতে পারেন, কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বাজার, গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা এবং দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর অপারেশনের চাহিদা মোকাবিলায় বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন।
এই উচ্চ ঝুঁকি কমাতে নীতিনির্ধারকদের কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি হতে আগ্রহী নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষায়িত অপারেশনাল ব্যাংকিং প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব উঠেছে। দ্বিতীয়ত, স্বার্থের সংঘাত এড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে অবসর বা স্থানান্তরের পর এমডি পদে যোগদানের আগে বাধ্যতামূলক ‘কুলিং পিরিয়ড’—যেমন দুই বা তিন বছর—নির্ধারণের কথা বলা হচ্ছে। তৃতীয়ত, নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর ‘ফিট অ্যান্ড প্রোপার টেস্ট’ চালু করা জরুরি, যেখানে প্রার্থীর অপারেশনাল দক্ষতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং বৃহৎ খেলাপিদের বিরুদ্ধে বাস্তব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা বদলাবে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়াই এ খাতকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন নীতিমালা একদিকে পুরোপুরি নেতিবাচক নয়, আবার নিশ্চিত আশাব্যঞ্জকও নয়। দীর্ঘদিনের সংকটে থাকা ব্যাংক খাতে এমন পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত বাস্তবে উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাই এই নীতিমালার সফলতা এখন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছা, কার্যকর তদারকি এবং ব্যাংক খাতে প্রকৃত সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর।
সাইফুল হোসেন: ফাইন্যান্স ও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট; ‘দ্য আর্ট অব পার্সোনাল ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট’, ‘আমি কি এক কাপ কফিও খাব না’, ‘দ্য সাকসেস ব্লুপ্রিন্ট’ ইত্যাদি বইয়ের লেখক।

