দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব ফেলছে গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তায়। নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঠিকমতো রাখায় ব্যর্থতার কারণে প্রায় পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুরক্ষা দুর্বল হয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই ঘাটতি অব্যাহত থাকলে সমস্যার প্রভাব কেবল সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সাধারণ গ্রাহকের আমানতের সুরক্ষা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়বে। এর ফলে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা তৈরি হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ২৪টি ব্যাংকের প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি ছিল ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। তবে এই ব্যাংকগুলো রাখতে পেরেছে মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। ফলে সম্মিলিত সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা।
এক বছর আগের সেপ্টেম্বরে প্রভিশন ঘাটতি ছিল মাত্র ৫৬ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি স্বাভাবিক আর্থিক চক্রের ফল নয়। বরং দীর্ঘদিন আড়াল করে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের প্রকৃত চিত্র সামনে আসার পরিণতি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পালাবদলের পর ব্যাংকিং খাতে পুনর্গঠিত, পুনঃতফসিলকৃত, অবলোপনকৃত ও আদালতে আটকে থাকা ঋণসহ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে এসব ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের মোট পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১০ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা এবং মন্দমানের কুঋণ ৫ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। এসবের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “প্রভিশন ঘাটতি মানে সরাসরি আমানতকারীর ঝুঁকি। গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক ব্যাংক ন্যূনতম সঞ্চিতিও গড়ে তুলতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে সময়মতো প্রভিশন না রাখতে পারলে ওই ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ হওয়া উচিত।”
ব্যাংকিং বিধি অনুযায়ী, সাধারণ ঋণের বিপরীতে ০.৫ থেকে ৫ শতাংশ, নিম্নমানের খেলাপি ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা লোকসান শ্রেণির খেলাপি ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হবে। তবে ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা, কম আমানত প্রবৃদ্ধি ও সামগ্রিক আর্থিক সংকট ব্যাংকগুলোর এই সক্ষমতা ক্রমেই সংকুচিত করছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, “খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের দ্রুত বৃদ্ধি প্রভিশন ঘাটতির মূল কারণ। সরকারের পালাবদলের পর এসব ঝুঁকি প্রকাশ্যে আসায় ব্যাংকিং খাতের ভেতরের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে।”
ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ডাইনামিক প্রভিশনিং চালুর পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, “ডাইনামিক প্রভিশনিং চালু হলে ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়বে, মূলধনের চাপ কমবে এবং কুঋণ হ্রাস পেলে প্রভিশন ঘাটতিও কমে আসবে।”

