বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি একীভূত ব্যাংকের আমানতকারীদের হিসাব থেকে আগে দেওয়া মুনাফা কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে এই ব্যাংকের বিনিয়োগকারীরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কোনো মুনাফা পাবেন না।
এই সিদ্ধান্তের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর আমানতকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা তাদের অবস্থান জানাচ্ছেন। কেউ কেউ সশরীরে ব্যাংকে গিয়ে প্রতিবাদ করছেন। কিছু ব্যাংক শাখায় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির খবরও পাওয়া গেছে।
আমানতকারীরা বলছেন, ‘ব্যাংকে আমানত রাখা আমাদের জন্য দুঃখজনক হয়ে গেছে। আমরা তো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ব্যাংকেই টাকা রেখেছিলাম।’ তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদত্যাগেরও দাবি তুলেছেন। গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করে। একই দিনে পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে হেয়ারকাটের তথ্য জানানো হয়। পাশাপাশি সব আমানতকারীর হিসাব পুনর্গণনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংক হলো: ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এগুলোকে একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়েছে—সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে অনৈতিক বলছেন সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী। তিনি জানান, ‘ব্যাংক যদি লস করার পরও মুনাফা দেয়, দায় তখন সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের। তা বিনিয়োগকারীর ওপর বর্তায় না। এটি একটি অনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিছু বিনিয়োগকারী সুবিধাপ্রাপ্ত হলেও যারা এখনও টাকা রেখেছেন, তাদের ওপর হেয়ারণার প্রভাব পড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত, তাই তারা মুনাফার ওপর কর দিয়েছে। সরকার কি সেটা ফেরত দেবে?’
অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও সাবেক চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘এতে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। অনেক আমানতকারী জরুরি প্রয়োজনেই টাকা তুলতে পারছেন না। এবার তাদের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফাও কেটে নেওয়া হবে। যারা আগেই টাকা তুলেছেন, তারা সুবিধাপ্রাপ্ত। সমান বিচার হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের বাইরে গিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক শাহানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের হাতে আর কিছু নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আমরা জিম্মি হয়ে গেছি। যারা টাকা তুলেছে, তাদের মুনাফা কাটা সম্ভব হবে না। তবে হিসাব নেগেটিভ করা হতে পারে।’ অন্য গ্রাহক মেহনাজ বেগম বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ধীরে ধীরে আমাদের সমস্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমার বাবার চিকিৎসার জন্য ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারছি না। তারা বলছে ঋণ নিন। কিন্তু আমি কেন আমার টাকা না নিয়ে ঋণ নেব?’
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, এই পাঁচ ব্যাংক ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাই ওই দুই বছরের মুনাফা দেওয়া হচ্ছে না। ব্যাংকগুলোতে ৭–৯ শতাংশ মুনাফার আমানত ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে দুই বছরের মুনাফা কমে যাবে, আমানতের স্থিতিও কমবে। তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকে ৭৫ লাখ আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। এর বিপরীতে ঋণ ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ খেলাপি।
গত বৃহস্পতিবার গভর্নর জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সম্পূর্ণ শরিয়াহ আইন মেনে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পূর্বের মুনাফা বিতরণও প্রশ্নবিদ্ধ।’
আমানতকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে হিসাব করা হচ্ছে। ব্যাংক যদি মুনাফা করতে না পারে, তাহলে দুই বছরের মুনাফা কীভাবে দেওয়া হলো। সরকার মুনাফার ওপর কর কেটে নিয়েছে, সেটা কি ফেরত দেওয়া হবে। এছাড়া শরিয়াহ আইনের নামে মুনাফা কর্তন কি বৈধ, তা জানতে চাচ্ছেন তারা। বঞ্চিত আমানতকারীরা হেয়ারকাটের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন না। তারা গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

