জুলাই আন্দোলনের পর সরকার পতনের সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তড়িঘড়ি করে আর্থিক খাত সংস্কারের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এই পদক্ষেপের মধ্যে কমপক্ষে তিনটি পদক্ষেপ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের উদ্বিগ্ন করেছে।
বিশেষ করে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করা এবং তাদের শেয়ার মূল্য শূন্য ঘোষণা করা খাতের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও আমানতকারী উভয়কেই বড় ঝুঁকিতে ফেলেছে। একই সময়ে ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েও পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা করেছে, এই ব্যাংকের আমানতকারীরা দুই বছরের কোনো মুনাফা পাবেন না।
অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব সিদ্ধান্ত দেশের পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকে ঠেলেছে। খায়রুল ও শিবলী কমিশন বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে একচেটিয়া সুবিধা দেয়ায় পুঁজিবাজার ধ্বংসের প্রান্তে চলে গেছে।
গত ৫ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদের কমিশন শেয়ারহোল্ডার ও বিনিয়োগকারীদের নানা স্বপ্ন দেখালেও, সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। প্রায় দেড় বছর পুঁজিবাজারে কোনো কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। কিছু আইপিও আনতে ব্যর্থ হয়েছে কমিশন। অনিয়মে জড়িতদের ১৭০০ কোটি টাকা জরিমানা করা হলেও এখন পর্যন্ত এক টাকাও আদায় করা যায়নি। সবচেয়ে বড় ধাক্কা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একতরফা সিদ্ধান্তে পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার শূন্য হয়ে যাওয়া।
পুঁজি বাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী মেহেদি হাসান বলেন, “১৯৯৬ ও ২০১০ সালের পুঁজিবাজার লুটপাটের সঙ্গে এ পরিস্থিতি তুলনা করলে কোনো অংশে কম নয়। শেয়ার শূন্য ঘোষণা করলে আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেউ আর শেয়ার কিনতে চাইবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একক সিদ্ধান্তের ফলে সিকিউরিটিজ কমিশন এখন নখদ্বন্তহীন বাঘে পরিণত হয়েছে।” গত ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের হিসাব পুনর্গণনার নির্দেশ দিয়েছে। এই পাঁচটি ব্যাংক হলো–ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এই ব্যাংকগুলো বড় অঙ্কের লোকসান করেছে। তাই দুই বছরের মুনাফা দেওয়া হবে না। ব্যাংকগুলোতে ৭ থেকে ৯ শতাংশ মুনাফার আমানত রয়েছে। নতুন সিদ্ধান্তে এই মুনাফা কমে যাবে এবং আমানতের স্থিতিও হ্রাস পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকে ৭৫ লাখ আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, রেজল্যুশন স্কিমের সুষম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের অবস্থানের ভিত্তিতে সব আমানত পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত কোনো মুনাফা বা লাভ বিবেচনা করা হবে না। আমানতের ওপর ‘হেয়ারকাট’ প্রযোজ্য হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার ফলে আমানতকারীরা তাদের দুই বছরের অর্জিত মুনাফা হারাবেন। আগের তুলনায় আমানতের স্থিতিও কমে যাবে। এর আগে একীভূত ব্যাংকগুলোর শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হয়। ফলে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী উভয়ই শেয়ার হারিয়েছেন।
পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। অন্য চারটি ব্যাংক ছিল চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদের নিয়ন্ত্রণে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, “পুঁজিবাজারে ধারণা করা হতো ব্যাংক সেক্টর সবচেয়ে নিরাপদ। কিন্তু বছর শেষে দেখা গেল পাঁচটি ব্যাংক প্রায় নিঃস্ব। উদ্যোক্তারা শেয়ার হারাচ্ছেন। এমন সিদ্ধান্ত সামগ্রিকভাবে ব্যাংক সেক্টরে বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল।” তিনি আরও বলেন, “সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ রয়েছে এমন ক্ষেত্রে কোনো একক সংস্থা একক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আমাদের আলোচনার প্রস্তাব উপেক্ষা করা হয়েছে।”
ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলছেন, “পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে শেয়ার শূন্য হয়েছে। ৯টি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানও অবসায়িত হবে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব। এজন্য দায়ী নিয়ন্ত্রক সংস্থার অব্যবস্থাপনা। বিএসইসি যদি আয়–ব্যয়ের ওপর নজর না রাখে, ভবিষ্যতেও এমন পরিস্থিতি ঘটতে পারে।” এদিকে বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ সাংবাদিকদের সাক্ষাৎ দেননি। মুঠোফোনে এসএমএস পাঠালেও কোনো উত্তর পাননি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এম. হেলাল আহম্মেদ জনি বলেন, “ব্যাসেল ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে পর্যাপ্ত মূলধন ধরে রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হার ১২ শতাংশ। যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ হতো, শেয়ারহোল্ডারদের ঝুঁকি কমত। কিন্তু পাঁচ ব্যাংক অবসায়নের প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়েছে। ফলশ্রুতিতে আমানত ও বিনিয়োগের হার কমছে। লিকুইডিটি ক্রাইসিস বাড়ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের সম্পদ সুরক্ষা সর্বোচ্চ নিশ্চিত করতে হবে।”

