বাংলাদেশ ব্যাংক চারটি সংকটাপন্ন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সঙ্গে এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে নতুন প্রতিষ্ঠান ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করেছে। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. আহসান এইচ মনসুর। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি দুর্বল ব্যাংকগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। তারই অংশ হিসেবে নেওয়া হয় একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সীমাহীন লুটপাট ও অনিয়মে ব্যাংক খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এক্সিম ব্যাংক দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের। অন্য চারটি ব্যাংক ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। নজরুল ইসলাম মজুমদার ও সাইফুল আলম দুজনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে নামে-বেনামে তাদের শেয়ার মালিকানা ও ঋণসম্পর্কিত সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে ছিল এক্সিম ব্যাংক। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু চারটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করলে কার্যকর সমাধান আসত না। ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে শক্ত ভিত্তির একটি ব্যাংক যুক্ত করার প্রয়োজন পড়ে। সে কারণেই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এক্সিম ব্যাংককে।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এখনও এক্সিম ব্যাংকের অবস্থান তুলনামূলক ভালো। ব্যাংকটিতে তারল্য সংকট নেই। নগদ জমা বা বিধিবদ্ধ জমারও কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি। মূলধন ঘাটতির সমস্যাও নেই। বড় অঙ্কের ঋণের বিপরীতে নিয়মানুযায়ী পর্যাপ্ত জামানত সংরক্ষিত রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের করা অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ বা একিউআরের গত বছরের তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ওই তথ্য অনুযায়ী, এক্সিম ব্যাংকের বিতরণকৃত মোট ঋণ ছিল ৫২ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৫ হাজার ১০১ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা।
এক্সিম ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নানা অপকর্মের কারণেই এক্সিম ব্যাংককে ঘিরে এত সমালোচনা তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার অতিমাত্রার দালালি এখন ব্যাংকটির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ভাষায়, প্রতিষ্ঠাতা বা পরিচালকের ভুলের দায় পুরো ব্যাংকের ওপর চাপানো হয়েছে। মূলত রাজনৈতিক রোষানলের কারণেই এক্সিম ব্যাংককে একীভূতকরণের সিদ্ধান্তে আনা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এক ডেপুটি গভর্নর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারের পুরো প্রক্রিয়াই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। নতুন সরকার এসে যদি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ অনুমোদন না করে, তাহলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকবে। তিনি বলেন, আগাম কোনো মন্তব্য করার আগে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ ব্যাংক খাত অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
ব্যাংক বিশ্লেষকদের মতে, চারটি দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক অনিয়ম ও কাঠামোগত দুর্বলতা আড়াল করতেই এক্সিম ব্যাংককে একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছিল। ওই সময়ে এক্সিম ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি ছিল তুলনামূলক শক্তিশালী। তারল্য পরিস্থিতি ও পরিচালন সক্ষমতাও ছিল অন্য ব্যাংকগুলোর চেয়ে ভালো। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে দুর্বল ব্যাংকগুলোর চাপ সামাল দিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে এতে একটি সুস্থ ব্যাংকের ওপর বাড়তি ঝুঁকি চাপানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তারা আরও সতর্ক করে বলেন, যদি স্বচ্ছ অডিট, দায়দেনার প্রকৃত হিসাব এবং শক্ত তদারকি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এক্সিম ব্যাংকের শক্ত অবস্থান কাজে লাগিয়ে পুরো ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব। তবে প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া শুধু একীভূতকরণ করলে আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অর্থনীতিবিদ বলেন, এক্সিম ব্যাংকের মতো একটি শক্তিশালী ব্যাংককে একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেনি। তার মতে, এটি ভবিষ্যতে একটি বাজে নজির হয়ে থাকবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সামনে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এভাবে বলির পাঁঠা হতে পারে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতেই বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সভাপতি ছিলেন নজরুল ইসলাম মজুমদার। ওই সময় তিনি বিভিন্ন ইস্যুতে ব্যাংকগুলো থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন। এর ফলে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পান তিনি। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রভাব খাটিয়ে তিনি ২২টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। পাশাপাশি অর্থ পাচারের মাধ্যমে বিদেশেও সম্পদ গড়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের একাধিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে নজরুল ইসলাম মজুমদারকে সরিয়ে দেয়। একই সঙ্গে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। ২০০৭ সাল থেকে তিনি এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি বিএবির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। গত ৫ আগস্টের পর তাকে বিএবির সভাপতির পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।
নজরুল ইসলাম মজুমদার পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক তার ব্যাংক হিসাব জব্দ করে। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

