একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আকস্মিক পদক্ষেপে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)সহ ৩০ কর্মকর্তাকে হঠাৎ বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। এটি নিয়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
এক্সিম ব্যাংকের কর্মকর্তা অভিযোগ করছেন, দক্ষ ও দীর্ঘদিন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের টার্গেট করে ওএসডি করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকের কর্মপরিবেশে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওএসডি হওয়া এক কর্মকর্তার মা এই খবর শুনে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সেই কারণে ওই কর্মকর্তা ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না। কর্মকর্তারা আরও অভিযোগ করছেন, সম্মিলিত পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংকই সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
ওএসডি হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছে এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইভিপি), জেনারেল ম্যানেজার (জিএম), সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি), ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম), ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি), অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম), অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি), ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রিন্সিপাল অফিসার (পিও) এবং সিনিয়র অফিসার (এসও) পদে থাকা কর্মকর্তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের দেওয়া প্রতিশ্রুতি নিয়েও। একীভূতকরণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সময় তিনি বারবার বলেছেন, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি থাকবে না। কিন্তু শীর্ষ ৩০ কর্মকর্তাকে ওএসডি করার ঘটনায় সেই আশ্বাস কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
এক্সিম ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, ওএসডি হওয়া কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। হঠাৎ তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ায় ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম ও কর্মকর্তাদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে দক্ষ কর্মকর্তাদের ওএসডি করার ফলে মানবসম্পদ সংকটও তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী অবস্থায় থাকা কর্মকর্তাদের স্থায়ীকরণের দাবিও তীব্র হয়ে উঠেছে। ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় প্রায় ২৪ বছর ধরে গোডাউন ইন্সপেক্টর ও গোডাউন গার্ড হিসেবে কর্মরত ৭০ কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা এখনও অস্থায়ী। তারা স্থায়ী হওয়ার আবেদন নিয়ে ২৮ জানুয়ারি গভর্নরের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেছেন। এছাড়া ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকরা ও তাদের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের একযোগে ওএসডি করা ও দীর্ঘদিনের জনবল সমস্যার সমাধান না হলে এটি পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য নেতিবাচক বার্তা দেবে। একীভূতকরণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল স্থিতিশীলতা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা। এক্সিম ব্যাংকের প্রশাসক মো. শওকাতুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
পেছনের ঘটনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়। অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা, পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা সরকার থেকে এসেছে। শেয়ার রূপান্তরের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের ১৫ হাজার কোটি টাকা মূলধনে রূপান্তর করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, “ওএসডি মানেই চাকরিচ্যুত নয়। ব্যাংকগুলোতে ফরেনসিক অডিট করা হচ্ছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে চাকরিচ্যুত করা হবে, তবে কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানি করা হবে না।”

