দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে থাকা সিটি ব্যাংকের নৈতিকতা ও সুশাসন আজ প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যাংকের তিনজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বেআইনি সুবিধা গ্রহণ করে আমানতকারীর তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর তদন্ত প্রতিবেদনে।
বিএসইসির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ব্যাংকের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। কর্মকর্তারা ব্যাংকের তহবিলকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেবল পোর্টফোলিও ম্যানেজারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে, অন্যদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তদন্তে উঠে এসেছে, তিনজন ডিএমডি—এ কে এম সাইফ উল্লাহ কাওছার, মোহাম্মদ মাহমুদ গনি ও মো. আশানুর রহমান—সহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ব্লক মার্কেটে লেনদেনের মাধ্যমে অন্যায় সুবিধা নিয়েছেন। বিশেষ করে পোর্টফোলিও ম্যানেজার মো. সানোয়ার খান ও তার স্ত্রী আসমাউল হুসনা ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করে অবৈধ লেনদেনে জড়িত ছিলেন।
বিএসইসির তদন্ত অনুযায়ী, সানোয়ার খান কাউন্টারপার্ট ট্রেডিং-এ যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ, একদিকে তিনি ব্যাংকের পক্ষে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, অন্যদিকে নিজের এবং স্ত্রীর নামে ব্যক্তিগত ক্রেতা হিসেবে লেনদেন করছিলেন। এটি সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত এবং নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত লেনদেনের মধ্যে অগ্নি সিস্টেমস, ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিট এবং বিডি পেইন্টসের শেয়ার রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাংকের তহবিল ব্যবহার করে ৩০ টাকায় শেয়ার কেনা ও পরে ৪১.২০ টাকায় ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে কোটি টাকার অবৈধ মুনাফা অর্জন করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় মুনাফা এসেছে ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিটের লেনদেন থেকে। ব্যাংক যখন পুঁজিবাজারে লোকসান গুনছে, সেখানে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ আমানতকারীর অর্থে বেড়ে গেছে। বিএসইসির এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ব্যাংকের সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
গত জানুয়ারিতে অগ্নি সিস্টেমসের শেয়ার কেলেঙ্কারিতে পোর্টফোলিও ম্যানেজার মো. সানোয়ার খান, তার স্ত্রী ও ভাইকে বিএসইসি জরিমানা করেছে। একই ঘটনার জন্য সিটি ব্যাংককেও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। গত বছরের ১০ জুলাই, ব্যাংক বিএসইসির অনুসন্ধানের জবাবে দাবি করেছিল, সানোয়ার খানের লেনদেনগুলো তখনকার ব্যাংকের বিনিয়োগ নীতিমালার পূর্ণ সম্মতিতে করা হয়েছে। তবে, যখন বিএসইসি লেনদেনের অনুমোদন বা অভ্যন্তরীণ নীতি লঙ্ঘনের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চায়, তখন ব্যাংক ভিন্ন তথ্য প্রদান করে।
পরে ব্যাংক জানায়, ওই সময়ে ব্লক লেনদেনের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো নীতি বা নির্দেশনা ছিল না। ফলে, এই অসামঞ্জস্যতা ইঙ্গিত দেয় যে, ব্যাংক নিজের বিনিয়োগ নীতিমালার ফাঁক ব্যবহার করে ব্যক্তিগত লাভজনক লেনদেন বৈধ বা অপরাধ আড়াল করতে চেয়েছে।
শুধু সানোয়ার খান নয়, ডিএমডি এ কে এম সাইফ উল্লাহ কাওছার, মোহাম্মদ মাহমুদ গনি ও মো. আশানুর রহমান-এর বিরুদ্ধে বিএসইসির তদন্তে গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। তারা বিভিন্ন শেয়ারে ব্লক মার্কেটে সিটি ব্যাংকের তহবিল থেকে কম দামে শেয়ার কিনে, আবার একই তহবিলে বেশি দামে বিক্রি করে অন্যায় সুবিধা গ্রহণ করেছেন।
তদন্তে দেখা যায়, ডিএমডি সাইফ উল্লাহ কাওছার ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর লাভেলো কোম্পানির ২৫ হাজার শেয়ার ব্যাংকের কাছে বিক্রি করেছেন প্রতি ৯৭ টাকায়, যেখানে বাজারদর ছিল ৯২.২০ টাকা। এ লেনদেন থেকে তিনি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা অন্যায় মুনাফা অর্জন করেন। ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মিডল্যান্ড ব্যাংকের ৩.৫ লাখ শেয়ার একইভাবে বিক্রি করে ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা বেআইনি মুনাফা করেছেন।
অন্যদিকে ডিএমডি মোহাম্মদ মাহমুদ গনি মিডল্যান্ড ব্যাংক ও ফাইন ফুডসের শেয়ার ব্লক মার্কেটে কিনে ও বিক্রি করে ৫ লাখ ৭১ হাজার টাকা লাভ করেন। ডিএমডি মো. আশানুর রহমান মিডল্যান্ড, সানলাইফ ও ওরিয়ন ইনফিউশনসের লেনদেনে ৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বেআইনি মুনাফা অর্জন করেছেন।
বিএসইসি ১৬ সেপ্টেম্বর ব্যাংক কর্মকর্তাদের তহবিল অপব্যবহারের বিষয়ে ব্যবস্থা জানতে চিঠি পাঠালে, কয়েক দিন পর সানোয়ার খানকে চাকরিচ্যুত করা হয়, কিন্তু অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই প্রসঙ্গে সানোয়ার খান জানান, ব্যাংক তাকে বাধ্য করে ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিট বিক্রি করতে। তিনি দাবি করেন, তিনি ব্লক লেনদেনের মাধ্যমে ইউনিট বিক্রি করেছেন এবং এর মধ্যে তার ও অন্যদের অংশ রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সব দোষ মো: সানোয়ারের ঘাড়ে চাপিয়ে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, অন্যদের কিছু হয়নি। যারা প্রমাণিতভাবে অন্যায়ে জড়িত তাদের সবার বিরুদ্ধে শাস্তি প্রয়োজন, যাতে ব্যাংকের সুশাসন ও নৈতিকতা পুনর্বহাল হয়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘একই অপরাধে পদভেদে শাস্তি ভিন্ন হওয়া ঠিক নয়। আইন ভঙ্গকারী প্রত্যেককেই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম জানান, বিষয়টি এনফোর্সমেন্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সিটি ব্যাংকের প্রভাবশালী এমডি ও সিইও মাসরুর আরেফিন, যিনি ২০১৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বছরের জানুয়ারিতে তৃতীয় মেয়াদে পুনর্নিয়োগ পেয়েছেন, বলেন, ‘এখন পর্যন্ত একজনের অপরাধই প্রমাণিত হয়েছে। তিনিই বাকিদের ব্যবহার করেছেন। তাই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাকিদের বিষয়ে পরে জানানো হবে।

