পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি-র পরিচালনা পর্ষদে সাতজন স্বতন্ত্র পরিচালক বসানো হয়েছে, যদিও এ ধরনের পদক্ষেপের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
জানা গেছে, প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের বাইরে রেখে এই স্বতন্ত্র পরিচালকরা ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজের হাতে নিতে তৎপর। এদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুল আলম খান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল পরিস্থিতি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছেন। ব্যাংকের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে কেউ কেউ “সংস্কার” আড়াল করে নিজের সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত ছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে, এনআরবিসি ব্যাংক শুদ্ধতার আড়ালে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রকৃত বিনিয়োগকারী বা শেয়ারহোল্ডারদের উপেক্ষা করে ব্যাংকটিকে কম মূল্যে দখলদারদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা চলতে পারে। এমন পরিস্থিতি এনআরবিসি ব্যাংককে এক ধরণের “পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র” হিসেবে পরিণত করেছে, যেখানে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে।
গত বছরের ১২ মার্চ কোনো প্রমাণ বা কারণ ছাড়াই এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি-র পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর পুরো বোর্ড গঠন করা হয় সাতজন স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে, যা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-র নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণই অনিয়মিত। আইন অনুযায়ী কোনো বোর্ডে এক-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত স্বতন্ত্র পরিচালক থাকতে পারে, কিন্তু এনআরবিসি ব্যাংকে সম্পূর্ণ বোর্ডই স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে গঠন করা হয়।
তৎকালীন সময়ে, ব্যাংকটি সারাদেশে প্রায় এক হাজার ২০০ শাখা ও সাব-শাখা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছিল। এসএমই খাতে প্রথম সারির ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছিল এবং মুনাফার ভিত্তিতে দেশের প্রথম ২০ ব্যাংকের মধ্যে নাম ছিল। অথচ এমন অবস্থাতেই উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের ছাড়াই বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়। এতে একটি কুচক্রমহল সুযোগ বুঝে ব্যাংকটিকে সমস্যাপূর্ণ অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে তুলনা করে নিজেদের সুবিধা হাসিলের চেষ্টা চালিয়েছে।
নতুন পরিচালনা পর্ষদে কৃষি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া চেয়ারম্যান করা হয়। বোর্ডে বসানো হয় সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের পরিচিত ও সহপাঠী প্রফেসর ড. সৈয়দ আবুল কালাম আজাদসহ অন্যান্য লোকজন। যদিও সৈয়দ আবুল কালাম প্রাথমিক কয়েকটি সভায় অংশ নেন, গত এক বছরে একদিনও বোর্ড সভায় উপস্থিত হননি। তবু তাকে বোর্ডে বহাল রাখা হয়েছে।
নতুন বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকের আমানত ছিল প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা, ঋণ ১৪ হাজার কোটি টাকার উপরে এবং শ্রেণিকৃত ঋণের হার মাত্র ৫ শতাংশের নিচে। ব্যাংকের এই সুস্বাস্থ্য শেয়ারহোল্ডার ও কর্মকর্তাদের জন্য গর্বের বিষয় হলেও নতুন বোর্ডের জন্য এটি অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চেয়ারম্যান আলী হোসেন প্রধানিয়া ধীরে ধীরে ব্যাংকের ভাবমূর্তী ক্ষয় করার পরিকল্পনা চালাতে থাকেন। তিনি গণমাধ্যমে বারবার বলেন, ব্যাংকে অনেক অনিয়ম হয়েছে এবং ঘোষিত তথ্য সঠিক নয়। একই সঙ্গে নতুন বোর্ড কর্মকর্তাদের বোর্ডে ডেকে প্রমাণ ছাড়াই “চোর” বলে সম্বোধন করে তাদের নৈতিক মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। লক্ষ্য ছিল একটাই—গ্রাহক ও জনমনের কাছে ব্যাংকের ভাবমূর্তী নষ্ট করে এটিকে খাদের কিনারে ঠেলে দেওয়া।
নতুন পরিচালনা পর্ষদ ছয় মাসের মধ্যেই পূর্বের ২০ হাজার কোটি টাকার আমানত ছাড়িয়ে যাওয়ার মাইলফলককে নিজেদের অর্জন বলে প্রচার করে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা যাতে ব্যবসার দিকে মনোযোগ দিতে না পারে, তার জন্য তুচ্ছ বিষয় নিয়েও অডিট চালানো ও শোকজ করার সংস্কৃতি তৈরি করা হয়। এ কাজে সহযোগিতার জন্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়, মো. তৌহিদুল আলম খান যিনি আগে ন্যাশনাল ব্যাংক-এ দুর্নীতির দায়ে চাকরিচ্যুত ছিলেন এবং বাজারে ব্যর্থ এমডি হিসেবে পরিচিত।
নতুন বোর্ডের আচরণ ও কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার কারণে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ শতাংশ। তৎকালীন সময়ে অন্যান্য ব্যাংকের বোর্ড ভাঙা ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হারও ৫০ শতাংশের নিচে ছিল না।বোর্ডের উদ্দেশ্য ছিল খেলাপি ঋণ বাড়িয়ে দেখানো, যা তাদের পরবর্তী স্বার্থ হাসিলের মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে।
পরবর্তী সময়ে নতুন কৌশল অনুসরণ করা হয়। ব্যাংকের হেড অফিস থেকে দক্ষ কর্মকর্তা অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি কিছু অফিসারকে চাকরিচ্যুত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এমন প্রেক্ষাপটে, ২১ আগস্টে নির্ধারিত ১২তম বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) উপলক্ষে বোর্ড শেয়ারহোল্ডারের বাইরে নিজস্ব সুবিধা হাসিলের চেষ্টা চালায়।
কৌশলগতভাবে, এজিএমে ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে পরিচালক নির্বাচনের এজেন্ডা বাদ দেওয়া হয়। স্বতন্ত্র পরিচালক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও যথাযথ বিধিমালা মানা হয়নি। প্রকৃত স্পন্সর শেয়ারহোল্ডারদের উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন এড়িয়ে এজিএমে পাস করানো হয়। শেয়ারহোল্ডার যাতে সশরীরে উপস্থিত না হতে পারে, সেই কারণে এজিএম ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় আয়োজন করা হয়। উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডজনখানেক বাউন্সার এবং প্রায় ৫০ জন পাহারাদার রাখা হয়। এভাবে বোর্ড শেয়ারহোল্ডারের সরাসরি অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী পাস করায় নিজের স্বার্থ সুনিশ্চিত করার চেষ্টা চালায়।
এনআরবিসি ব্যাংকের ১২তম বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) শেয়ারহোল্ডারদের সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার জন্য প্রণোদিতভাবে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়নি। আইনের প্রয়োজনে নামকাওয়াস্তে অখ্যাত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে কেবল আনুষ্ঠানিকতা দেখানো হয়। সাধারণ রীতি অনুযায়ী এজিএমের এজেন্ডা ও তারিখ শেয়ারহোল্ডারদের মেইলের মাধ্যমে জানানো হয়, কিন্তু এনআরবিসি ব্যাংকে তা করা হয়নি। উপরন্তু, ভুয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে ব্যাংকের টাকায় লোক ভাড়া করে এজিএম সম্পন্ন করা হয়েছে।
এজিএমের পর ব্যাংকের অর্গানোগ্রামে পরিবর্তন আনা হয়। এমডি মো. তৌহিদুল আলম খান চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া-এর সহযোগিতায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অগোচরে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের লোক বসান। বোর্ডের অনেক সদস্যও এ বিষয়টি জানতেন না। ব্যাংকের সব গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন নিয়োগের মাধ্যমে হেড অফিসে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ডিএমডি, সিএফও, সিএইচআরও, সিএলও এবং হেড অব ট্রেনিং ইনস্টিটিউটসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বজনপ্রীতি ও অনৈতিক নিয়োগের অভিযোগ ওঠে। উদাহরণ দিয়ে বললে দেখা যায়,
- এমডি তৌহিদুল আলম খান সিএফও পদে রশেদুল ইসলাম-কে নিয়োগ দেন, যিনি আগে সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারিয়েছিলেন।
- স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে চাকরি হারানো এস কে তারেক নেওয়াজকে প্রমোশন দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়।
- ফয়সাল আহমেদ, যিনি সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার ব্যাংকে স্বজনপ্রীতি ও অনৈতিক কাজে অভিযুক্ত ছিলেন, তাকে সিএইচআরও পদে প্রমোশন দেওয়া হয়।
- চেয়ারম্যান নিজেও নিজের বান্ধবী ফাহমিদা চৌধুরীকে প্রমোশন দিয়ে ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রধান নিয়োগ দেন, মাসিক বেতন সাড়ে ৫ লাখ টাকা।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি ছাড়াও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন নিয়োগ থেকে কমিশন নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। বর্তমানে প্রায় ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের জন্য সার্কুলার জারি হয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার নামে নিয়োগপ্রাপ্ত স্বতন্ত্র পরিচালকরা এখন নানা অনিয়মে জড়িত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আবুল বশর এনআরবিসি ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া ও এমডি মো. তৌহিদুল আলম খান-এর অনৈতিক কাজের সুযোগ গ্রহণ শুরু করেন।
জানা গেছে, আবুল বশর এনআরবিসি সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান পদও দখল করেছেন। সিকিউরিটিজ থেকে তিনি প্রতি মাসে গাড়ির ভাতা হিসেবে এক লাখ টাকা নিচ্ছেন। এছাড়া ঢাকায় আসার সময় পরিবারসহ ব্যাংকের টাকায় পাঁচ তারকা হোটেলে অবস্থান করছেন। স্বতন্ত্র পরিচালকরা বিভিন্ন অজুহাতে ব্যাংক থেকে অন্যান্য ভাতার নামেও অর্থ নিচ্ছেন। প্রতি সপ্তাহে বোর্ড মিটিংয়ে আগের ১০ হাজার টাকার পরিবর্তে ৩০ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা গ্রহণের ঘটনা ঘটে। ব্যাপক সমালোচনার পর ভাতা আবার আগের স্থিতিতে নামানো হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও ব্যাংক কর্মকর্তারা পরিষ্কার ও যোগ্য উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বোর্ড পুনর্গঠন জরুরি মনে করছেন। তারা সতর্ক করছেন, এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংক দখলের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা খুব কম সময়ে সম্ভব হবে।
ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম অস্থিরতা, ব্যবসা ক্রমেই কমছে। গত দুই মাসে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ডিপোজিট হারিয়েছে ব্যাংক। গ্রাহক আস্থা ক্ষয় পাচ্ছে চতুর্থ প্রজন্মের এই শক্তিশালী ব্যাংকে। এছাড়া, বর্তমান বোর্ডের নেতৃত্বে পরিচালন মুনাফা ৪৫৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের প্রায় ৮০০ কোটি টাকার তুলনায় অনেক কম। কোম্পানির অনিয়ম নিয়ে জানতে কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. ফিরোজ আহমেদ-কে একাধিকবার কল ও খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম বলেন, “বিএসইসি কোনো ব্যাংকের বোর্ড গঠন বা পরিচালনা প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না। তবে কোনো কোম্পানি করপোরেট গভার্নেন্স কোড-২০১৮ অমান্য করে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করলে আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।”

