নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ প্রতিদিনের ঘামঝরা সঞ্চয় দিয়ে ব্যাংকের খাতকে ভরছেন। মাস শেষে বেতনের কিছু অংশ, ফসল বিক্রি থেকে যে অতিরিক্ত আয় আসে, ছোট ব্যবসার লাভ—সব মিলিয়ে গড়ে উঠছে দেশের ব্যাংক খাতের ভরতা। তবে ঋণ নিতে গেলে তাঁদের অবস্থা ভিন্ন। অনেক সময় প্রয়োজনের পরও তাঁরা ব্যাংকের দরজায় খালি হাতে ফিরে যান।
পরিসংখ্যান বলছে, ২৫ লাখ টাকার নিচে আমানতকারী গ্রাহকের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশের আমানত দুই লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে, আর ১৪ শতাংশের জমা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকের মূল ভিত্তি তৈরি হচ্ছে নিচতলার মানুষের সঞ্চয়ের ওপর। কিন্তু ঋণের সুযোগ নিতে গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন। গত সেপ্টেম্বরে বিতরণকৃত মোট ঋণের মাত্র ১৩ শতাংশই কৃষি, ফিশারি, বনজ চাষ এবং ব্যক্তি খাতে গিয়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের হাতে। বাকি বড় অংশ বড় শিল্প ও করপোরেট খাতে গেছে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা প্রান্তিক কৃষকরা বলছেন, ঋণ পেতে গেলে ব্যাংকের দরজায় শুধু কাগজ নয়, প্রয়োজন পরিচয়ও। ‘ওপর তলার’ কারো সুপারিশ বা যোগাযোগ না থাকলে ফাইল স্থবির থাকে। জামানত, গ্যারান্টার ও কাগজপত্রের জটিলতা পার হয়ে অনেকেই হাঁপিয়ে উঠেন। ফলশ্রুতিতে, যাদের সঞ্চয়ে ব্যাংকের ভল্ট ভরা, তাঁরা ঋণের কাউন্টারে প্রায়ই খালি হাতে ফেরেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ মূলত চাকরি বা ছোট ব্যবসা থেকে সঞ্চয় গড়ে তুলেন। তাঁরা বড় শিল্প স্থাপন বা বৃহৎ বিনিয়োগে সাধারণত এগোই না, তাই ঋণের চাহিদাও সীমিত। অন্যদিকে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম আমানত রেখে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ায়। এটি অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ।
তবু বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তোলেন, স্বাভাবিক প্রবাহ কি সবার জন্য সমান? তাদের মতে, প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকদের জন্য ঋণ প্রাপ্তির পথ এখনও কাঁটাচাপা। ছোট ঋণের খেলাপির হার তুলনামূলক কম, অথচ বড় ঋণ বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, বাড়ায় খেলাপির বোঝা। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তাই বিশ্লেষকরা মনে করেন, সঞ্চয়ের মতো ঋণপ্রাপ্তিতেও সমতা আনলেই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফেরানো সম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “ব্যাংকগুলো যেন প্রান্তিক পর্যায়ে ঋণ বিতরণ বাড়ায়, সে জন্য আমরা তাগিদ দিয়ে যাচ্ছি। কারণ কৃষি ও এসএমই খাতে ঋণ দিলে কর্মসংস্থান তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে ব্যাংকের বিনিয়োগ নিরাপদ থাকে। আর বড় অঙ্কের ঋণ দিলে খেলাপির ঝুঁকি থাকে। সে ক্ষেত্রে ব্যাংক বড় লোকসানের মুখে পড়তে পারে। তাই আমরা চেষ্ট করছি, যেন প্রান্তিক পর্যায়ে বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ মূলত চাকরি বা ছোট ব্যবসা থেকে সঞ্চয় গড়ে তোলেন। তাঁরা বড় শিল্প স্থাপন বা বৃহৎ বিনিয়োগে সাধারণত এগোই না, তাই ঋণ চাহিদাও সীমিত। অন্যদিকে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম আমানত রেখে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ায়। দুই শ্রেণির মানুষের সঙ্গে ব্যাংক সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে। এটি অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ এবং খারাপ কিছু নয়। তবে ঋণ দেওয়ার সময় ব্যাংকগুলোকে দেখতে হবে—যে ঋণ দিচ্ছে তার ফেরত দেওয়ার ক্ষমতা কতটুকু। শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দিলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
বেসরকারি নীতি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও মাশরুর রিয়াজ বলেন, “ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কখনোই কে বেশি আমানত রেখেছে তার ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে ব্যবসার উদ্দেশ্য, ঋণগ্রহীতার যোগ্যতা এবং প্রকৃত নগদ প্রবাহের ওপর। কিন্তু আমাদের দেশে ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসায়ীদের বড় সমস্যা হলো—তারা অধিকাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। পর্যাপ্ত ডকুমেন্টেশন বা আর্থিক বিবরণী না থাকার কারণে ব্যাংকের জন্য ঋণ মূল্যায়ন ও পরিচালনা ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এজন্য ব্যাংকগুলো এসএমই খাতে তুলনামূলক উচ্চ সুদহার আরোপ করে এবং কাগজপত্রের শর্ত কঠোর রাখে।”
তিনি আরও বলেন, দেশের টেকসই উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হলে এই বাস্তবতা কাটিয়ে ওঠা দরকার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) শক্তিশালী না করে অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করা সম্ভব নয়। এজন্য কার্যকর ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম, বিশেষায়িত তহবিল, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহজ ঋণ মূল্যায়ন কাঠামো প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু উদ্যোগ থাকলেও বাস্তব প্রভাব সীমিত, তাই আরও সক্রিয় মনিটরিং ও নীতিগত সহায়তা জরুরি।
এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, কেবল জামানতনির্ভর প্রচলিত প্রক্রিয়ায় এসএমই খাতকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। নতুন মডেল দরকার—যেখানে নগদ প্রবাহ, ব্যবসার সম্ভাবনা ও ডেটাভিত্তিক মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি সুদহার যৌক্তিক করা, ডকুমেন্টেশন সহজ করা এবং ছোট উদ্যোক্তাদের উপযোগী আর্থিক পণ্য তৈরি করতে হবে। এতে খাত বিকশিত হবে এবং অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি সম্ভব হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, বড় ঋণেই খেলাপি ঋণের হার বেশি। ব্যাংকে বিতরণকৃত ঋণের ৪৫ শতাংশই ১০ কোটি টাকার কম ছোট ও মাঝারি গ্রাহকের ঋণ, যার ২৫ শতাংশ খেলাপি। তুলনায় সবচেয়ে বড় ঋণ, ৫০ কোটি টাকার ওপরে, খেলাপির হার ৫১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৬.৩ শতাংশ ঋণ খেলাপি। একই সময়ে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ ছিল ৪ লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যার খেলাপি হার ১৫.২ শতাংশ। এক কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যার খেলাপি হার ২৭.৯ শতাংশ। এ অনুযায়ী, এক কোটি থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে গড় খেলাপি হার দাঁড়ায় ২১.৫৫ শতাংশ।

