বাংলাদেশ ব্যাংক গত চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। নীতি অনুযায়ী ঋণের সুদহার বৃদ্ধি করে চাহিদা কমানোর চেষ্টা করা হলেও সাধারণ মানুষ এর সুবিধা পাচ্ছেন না। বরং দুই অংকের সুদহার বেসরকারি বিনিয়োগকে আরও সংকুচিত করেছে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা রেকর্ড গড়ে। ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত মাত্র চার অর্থবছরে ব্যাংকের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ১৯৯ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ৫১ হাজার ৫১২ কোটি টাকা সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে। এই মুনাফার বড় অংশ এসেছে বৈদেশিক মুদ্রার পুনর্মূল্যায়ন থেকে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ৯৮ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা আয় হয়েছে, যার মধ্যে ৫৩ হাজার ১৫ কোটি টাকা রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির মাধ্যমে সরাসরি অর্জিত। বাকি ৪৫ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা এখনও অনর্জিত হিসেবে রয়ে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিয়ে ত্রৈমাসিক বা স্বল্পমেয়াদি অর্থ সহায়তা প্রদান করে। এ থেকে প্রাপ্ত সুদও ব্যাংকের মুনাফার অংশ। তারল্য সহায়তার জন্য রেপো ও স্পেশাল লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি ব্যবহার করা হয়, পাশাপাশি পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ঋণ থেকেও আয় যুক্ত হয়। ফলে, মূল লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও জনগণ ঋণের সুবিধা না পেলে ও বেসরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত থাকলেও, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক অর্জন রেকর্ড ভেঙেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নেমে এসেছে জিডিপির মাত্র ২২.০৩ শতাংশে, যা ১০–১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত অর্থবছরে এটি ছিল ২৩.৯৬ শতাংশ। এটি দেশের দুর্বল ব্যবসায়িক পরিবেশের স্পষ্ট ইঙ্গিত। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ব্যাংক ঋণও ৯ শতাংশ কমে চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে দাঁড়িয়েছে। তীব্র সংকটের কারণে এই খাত আরও সংকুচিত হচ্ছে। একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেকর্ড মুনাফা অর্জন করেছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সংকটে নিপতিত।
গত চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ ও দায় প্রায় ৫২ শতাংশ বেড়েছে। তবে একই সময়ে দেশের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস নামিয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান কমেছে, বেকারত্ব বেড়েছে, এবং সঞ্চয় ভেঙে পড়ায় ভোগ ব্যয়ও কমেছে। আয় বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দারিদ্র্যতার হারও বেড়েছে বলে দেশি-বিদেশি সমীক্ষা জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য মুনাফা অর্জন নয়। তার দায়িত্ব হচ্ছে ব্যাংক খাত তদারকি করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিখাত বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও ব্যাংক খাতের সংকটের কারণে এ সময়ে ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও, এটি মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুনাফার উদ্দেশ্যে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করে না। তবে কোনো কাজের ফলে যদি মুনাফা হয়, সেটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরও জানিয়েছেন, “গত বছর মুনাফা থেকে ২২,৫৩৯ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনের মধ্যেই মুনাফা অর্জিত হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের আওতায় আমাদের যেসব দায়িত্ব আছে, আমরা সেগুলোই পালন করার চেষ্টা করছি।”
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা মুনাফার নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা ছিল ৫,৮৯১ কোটি টাকা। পরবর্তী বছর ২০১৯-২০ অর্থবছরে মুনাফা সীমিত ছিল ৬,২৮৯ কোটি টাকায়। ২০২০ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া কভিড-১৯ মহামারীর কারণে দেশের অর্থনীতিতে নজিরবিহীন স্থবিরতা নেমে আসে। সে সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে এবং বিভিন্ন খাতের জন্য স্বল্প সুদের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করে। ২০২০-২১ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা দাঁড়ায় ৫,৮২৪ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় ২০২২ সালের শুরুতে। দেড় দশকের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রভাবে ব্যাংক খাত ভেঙে পড়তে শুরু করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কভিড-১৯ থেকে পুনরুদ্ধার ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব। দেশের বাজারে তৈরি হয় নজিরবিহীন ডলার সংকট।
সংকট মেটানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিক্রি হয় ৭.৬২ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩.৫৮ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২.৭৯ বিলিয়ন ডলার। এই টানা তিন অর্থবছরের বিক্রির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের পতন আসে। ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে ২৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (বিপিএম৬) অনুযায়ী রিজার্ভ নেমে যায় ১৮ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে প্রতি ডলারের মূল্য ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকার বেশি হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য দেখায়, টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়নের প্রভাবে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বেড়ে যায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকের মুনাফা দাঁড়ায় ২৯,৩২৭ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ২৬,৩০০ কোটি টাকা আসে বিনিময় হার পুনর্মূল্যায়ন খাত থেকে। ডলার বিক্রির মাধ্যমে আয় হয় ২,৪১৮ কোটি টাকা।
ডলার বিক্রির ফলে ব্যাংকের মুনাফা বাড়ার পাশাপাশি বাজার থেকে তারল্যও উঠে যায়। ফলে দেশের ব্যাংক খাতে তৈরি হয় তারল্য সংকট। সংকট মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে রেপো ও এএলএসের মাধ্যমে অর্থ ধার দেয়। এতে সুদ খাত থেকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় বাড়তে থাকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মুনাফা দাঁড়ায় ৪৭,৩৪৪ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ৯,১৪৩ কোটি টাকা আসে সুদ খাত থেকে, ডলার বিক্রির মাধ্যমে আয় হয় ১৭,০৫২ কোটি টাকা এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ১৯,৩৪৫ কোটি টাকা অনর্জিত আয় হিসেবে থাকে।
মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হার বৃদ্ধির প্রভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নীতিসুদহার বাড়ানো হয়। এতে সুদ খাত থেকেও আয় বৃদ্ধি পায়। ওই বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা দাঁড়ায় ৪০,৫৬৬ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ১৫,৮৫০ কোটি টাকা আসে সুদ আয়ের মাধ্যমে, আর ডলার বিক্রি থেকে আয় হয় ২২,৮৭৮ কোটি টাকা।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারও পালিয়ে যান।। ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট দায়িত্ব নেন অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি নীতিসুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করে মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দেন। এর প্রভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সুদ খাত থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় রেকর্ড ২২,৫৩৯ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ডলার বিক্রি থেকে আরও ১০,৬৬৭ কোটি টাকা আয় হয়। এতে ব্যাংকের মোট মুনাফা দাঁড়ায় ৩৪,৯৬২ কোটি টাকা।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, কাঠামোগত কারণে ব্যাংকের মুনাফা এত বেশি বেড়েছে। তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদহার বৃদ্ধি করেছে। বর্ধিত সুদহারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। বেসরকারি ঋণে খেলাপি ঝুঁকি থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণে তা নেই।”
তবে এই অর্থনৈতিক সংকট ও বিনিময় হার বৃদ্ধির পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যর্থতাও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। “সঠিক সময়ে সুদহার বাড়ানো হতো, তবে মূল্যস্ফীতি এতটা বাড়ত না। বিনিময় হার ধীরে ধীরে বাজারে ছেড়ে দিলে ডলারের দাম এতটা উর্ধ্বমুখী হতো না। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও চাপাচাপির কারণে ক্ষতিটা এত বেশি হয়েছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্জিত মুনাফা থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ২২,৬২০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ এ সংখ্যা ছিল ১৫,৩৯১ কোটি, ২০২২-২৩ এ ১০,৬৫৩ কোটি এবং ২০২১-২২ এ ২,৮৪৮ কোটি টাকা। ফলে মাত্র চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে মোট ৫১,৫১২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ মন্তব্য করেন, “উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাত দীর্ঘদিন ধরে খারাপ পরিস্থিতিতে রয়েছে। উদ্যোক্তাদের বড় অংশ কেবল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। আমরা বহু আগে থেকে সুদহার কমানোর দাবি জানাচ্ছি। নতুন সরকারের মেকানিজমে আশা করি প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।”
রেকর্ড মুনাফার প্রভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ ও দায়ের পরিমাণও দ্রুত বেড়েছে। ২০২১ সালের জুনে মোট পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের জুনে বেড়ে ৭ লাখ ১০ হাজার ৪৬২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। চার বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫১.৭৯ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল দায়িত্ব মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও তার দায়িত্বের অংশ। প্রায় চার বছর ধরে মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভুগছে। বিনিয়োগ শূন্যতার এই পরিস্থিতিতে ব্যাংককে খুঁজে বের করতে হবে, কীভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখেও বিনিয়োগ বাড়ানো যায়। আইনের আওতায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে মুনাফা হতে পারে, কিন্তু মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়।”
বাংলাদেশ ব্যাংক মাত্র চার বছরে তার মুনাফা থেকে ৫১ হাজার কোটি টাকার বেশি সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে। কিন্তু একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক—সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক—পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যাংকগুলোর মধ্যে কেবল সোনালী ছাড়া বাকিগুলো অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে।
গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৪৪.৪৪ শতাংশ। একই সময়ে প্রভিশন বা সঞ্চিতি ঘাটতি প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা, যা মূলধন ঘাটতির চেয়েও কম। পুরো ব্যাংক খাতের ঋণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত অর্ধেকের বেশি ব্যাংক এখন রুগ্ণ, এবং এক ডজনের বেশি ব্যাংক গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এদিকে, রেকর্ড মুনাফার প্রভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বোনাসের দাবি ক্রমশ বেড়েছে। গত অর্থবছরে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী সর্বনিম্ন ছয়টি বোনাস (মূল বেতনের ছয় গুণ) পেয়েছেন। বোনাস দেওয়ার জন্য গভর্নরসহ পরিচালনা পর্ষদেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। শুধুমাত্র বোনাসে ১০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে, এবং এ বছরও একই হারে চাপ আসতে পারে বলে সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “মুনাফার স্বার্থে কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে না। নীতিসুদহার বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটি উপকরণ মাত্র। কিন্তু বাংলাদেশে মূল কারণ হলো বাজারের সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি। অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকার বাজারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। শুধুমাত্র সুদহার বাড়িয়ে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।”
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মন্তব্য করেন, “মুনাফা বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা আনন্দিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এ মুনাফায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই। গত কয়েক বছরে ব্যাংকে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা কাম্য নয়। অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলার স্বার্থে আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সুশাসন প্রয়োজন।”
ফলে দেখা যায়, একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেকর্ড মুনাফা, অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ক্রমাগত আর্থিক সংকট—এ দুই বাস্তবতা দেশের অর্থনীতিকে দ্বন্দ্বপূর্ণ অবস্থায় রেখেছে।

