বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ত্বরিত ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একজন দক্ষ গভর্নরের প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিজের ভিশনে সৃজনশীল নেতৃত্ব এবং সুশাসনের মাধ্যমে আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চায়। মিশনে বলা হয়েছে, ব্যাংক দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রগতিতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি, সরকারের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে পরামর্শ দেওয়া এবং সংকট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমর্থন দেওয়াও ব্যাংকের অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে।
এই লক্ষ্য পূরণে একজন গভর্নরের অভিজ্ঞতা অপরিহার্য। তাকে থাকতে হবে গভীর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক অর্থনৈতিক জ্ঞান। দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে কৌশলগতভাবে পরিচালনা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হতে হবে। উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, যেখানে গভর্নরের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়, সেখানে আর্থিক খাতে স্থায়ী শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি অর্জন সহজ হয়। একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান শুধু প্রশাসক নয়, বরং দেশের প্রধান ‘অর্থনৈতিক ঝুঁকি গ্রহণকারী’ হিসেবে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হতে হবে। এই কারণে, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এই পদে অপরিহার্য।
একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে দেশের প্রধান ‘অর্থনৈতিক ঝুঁকি গ্রহণকারী’ হিসেবে নেতৃত্ব দিতে হয়। তাই উন্নত দেশগুলোতে গভর্নর নিয়োগের সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। সেখানে গভর্নরের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়, এবং সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত অনুরোধে গভর্নর পদে পরিবর্তন আনা হয় না।
উদাহরণ হিসেবে, কানাডার নীতিমালায় বলা হয়েছে, গভর্নরের অবশ্যই আর্থিক বাজার এবং অর্থনীতি সম্পর্কে গভীর ধারণা থাকতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে গভর্নরের নীতি ও কর্মকৌশল দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে অত্যাবশ্যক।
একজন গভর্নরকে বহুপাক্ষিক সংস্থা যেমন আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি-এর অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে মিটিং ও সংলাপে অংশ নিতে হয়। এই আলোচনায় ব্যবসায় প্রশাসনের শব্দের চেয়ে অর্থনীতির পরিভাষা ব্যবহৃত হয়। অভ্যন্তরীণ নীতিমালা ও দপ্তরের বিষয় নিয়ে দরকষাকষি করা, আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশ নেওয়া এবং প্রশ্নোত্তর সেশনে দেশের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলা সবই গভর্নরের দায়িত্ব অর্থাৎ দেশের ভাবমূর্তিকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে গভর্নর অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তাই, দেশের বৃহৎ স্বার্থে একজন গভর্নরের কাছে শুধু আর্থিক ও অর্থনৈতিক জ্ঞানই নয়, বহুমাত্রিক জ্ঞানও থাকা আবশ্যক।
সম্প্রতি বিএনপি সরকার প্রথিতযশা একজন অর্থনীতিবিদকে সরিয়ে ব্যবসায়ী একজনকে গভর্নর নিয়োগ দিয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী বিরল ঘটনা। নতুন প্রতিটি সরকারের অবশ্যই নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা থাকে, যা স্বাভাবিক কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বিশেষজ্ঞদের, যাদের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকতে হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে একজন অর্থনীতিবিদকে নিয়োগ দেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
সারা বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গভর্নররা সাধারণত অর্থনীতিতে পারদর্শী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বাছাই করা হয়। তাদের নিয়োগ নীতিমালায় অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারে গভীর জ্ঞানকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয় কিন্তু বাংলাদেশে সম্প্রতি গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক জ্ঞানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, আর অর্থনীতির জ্ঞান উপেক্ষিত হয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কূটনৈতিক মহল এবং বিদেশি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, নতুন সরকার বিরল ও অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ নিয়েছে। এমন পদক্ষেপ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি করছে।
অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি সংকটপূর্ণ। উত্তরাধিকার সূত্রে বিএনপি সরকার ঋণনির্ভর এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি ছেড়ে গেছে। রপ্তানি আয় কমেছে, বিদেশি বিনিয়োগ নেই, রাজস্ব আয় কম। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে প্রভাব ফেলছে।
এ ধরনের মুমূর্ষু অর্থনীতিকে টেনে তুলতে নতুন সরকারের পরিকল্পনা কী? ব্যবসায়িক পটভূমির গভর্নর কতটুকু সক্ষম, তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বিরাজ করছে। মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষ সাশ্রয় ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কাজ হলো মুদ্রার জোগান নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যস্ফীতি কমানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। তবে এটি সহজ কাজ নয়। বিশ্বের সব দেশে সরকারপ্রধান গভর্নরকে চাপ দেয়, যাতে তারা অর্থ মুদ্রায় ছাপানোর মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারে। বাংলাদেশে রাজস্ব আয় কম হওয়ায় পরিচালন ব্যয় ও বার্ষিক উন্নয়ন খরচ পরিপূরণে বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, আর জনমনে প্রশ্ন রয়েছে ব্যবসায়িক পটভূমির গভর্নর কি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে?
নতুন সরকার যদি ব্যয় নির্বাহের জন্য টাকা ছাপাতে চায় এবং গভর্নর যদি দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার ব্যক্তি হন, তাহলে গভর্নরের স্বাধীনভাবে “না” বলার সুযোগ কমে যায়। সরকারের নির্দেশে মুদ্রা ছাপালে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। এক পর্যায়ে সাধারণ মানুষের আয় থেকে ব্যয় বেড়ে যাবে। তখন মানুষ সুষম খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং বিনোদন থেকে বঞ্চিত হবে। শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, পরিস্থিতি এমন হলে মানুষ রাস্তায় নেমে আন্দোলন শুরু করতে পারে, সংসদ সদস্যদের বাসভবনও ঘেরাও হতে পারে।
গভর্নরকে অর্থনীতির এই সকল চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে। জানা গেছে, নতুন গভর্নর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে ২৩তম সদস্য ছিলেন। এর অর্থ, গভর্নরকে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দলীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, যা অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।
ড. আহসান এইচ মনসুরকে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার মেয়াদ ছিল ২০২৮ সালের ১৩ আগস্ট পর্যন্ত। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সরকার তাকে অপসারণ করে। এই পদক্ষেপ দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে সমালোচিত হয়েছে। কারণ, দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য একজন গভর্নরকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় দেওয়া উচিত।
ইতিহাসে দেখা যায়, খালেদা জিয়া সরকার গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে এবং শেখ হাসিনা সরকার গভর্নর ড. সালেহউদ্দীন আহমেদকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় দিয়েছেন কিন্তু তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার ড. আহসান এইচ মনসুরকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় দিতে ব্যর্থ হয়।
বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব রাজনৈতিক সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার। ব্যাংকের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য না হলে সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বর্তমানে ব্যাংকে ৯টি সংগঠন সক্রিয়, যা বিশ্বের কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দেখা যায় না। এসব সংগঠনের মাধ্যমে আন্দোলন ডাকা হয়েছে এবং পূর্ববর্তী গভর্নরদের ড. আহসান এইচ মনসুর, খোরশেদ আলম, ফখরুদ্দিন আহমেদকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে গভর্নরদের এইভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার অনৈতিক অবক্ষয় দিন দিন গভীর হচ্ছে। অভিযোগ, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু শিল্পগোষ্ঠী ব্যাংক খাত থেকে বড় অঙ্কের টাকা লুট করেছে, যার বেশিরভাগই বিদেশে পাচার হয়েছে। শ্বেতপত্র অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে গেছে।
উত্তরাধিকার সূত্রে বিএনপি সরকার ভঙ্গুর ব্যাংক খাত এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। বর্তমানে ২৪টি ব্যাংক মূলধনের সংকটে রয়েছে এবং খেলাপি ঋণের হার এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বড় বাধা।
দুঃখজনক বিষয় হলো, বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’কে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংক খাতে দলীয় নিয়ন্ত্রণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ব্যবসায়িক পটভূমির অর্থমন্ত্রী এবং গভর্নরের মাধ্যমে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভাব্যতা কম।
তবুও জনগণ আশা করছে, অর্থনীতি সঠিক পথে ফিরে আসবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের দলীয় সংগঠন, গভর্নরের নিয়োগ নীতিমালা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্যাংকিং বিভাগ/আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ পুনর্গঠন করতে পারে, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে এবং অর্থনীতি দ্রুত উন্নতির পথে যাবে।

