বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন করে বাড়ায় এক লাফে তেলের দাম ১১৫ ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
আজ সকালে লেনদেন চলাকালে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ১০ সেন্ট। একদিনেই এটির দাম বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও ২ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেড়ে পৌঁছায় ১০২ ডলার ৩০ সেন্টে।
এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনাকে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সম্ভাব্য স্থল হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাজারে উদ্বেগ বাড়ে। এর জবাবে তেহরানও সতর্কবার্তা দিয়েছে। যদিও গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধ এড়াতে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সম্পৃক্ততায়। তারা ইসরায়েলের ওপর হামলা চালিয়েছে, ফলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের সংযোগপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি এখন অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে। এসব পথ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের বড় অংশ পরিচালিত হয়।
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় সরবরাহ সংকটের শঙ্কা বাড়ছে। পাশাপাশি তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলার কারণে গ্যাসের দামও ঊর্ধ্বমুখী। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় দাম ইতোমধ্যে ৩ দশমিক ৯৮ ডলারে পৌঁছেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি থামাতে পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর ও তুরস্ক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাম্প্রতিক বৈঠক ইতিবাচক হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। পাকিস্তান জানিয়েছে, খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপে সহায়তা করা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে এশিয়ার ছোট অর্থনীতিগুলোর ওপর। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে তেল পরিবহন হয়, তার বড় অংশই এশিয়ার বাজারে যায়। একই সঙ্গে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়বে। র্যাপিডান এনার্জির প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকন্যালির মতে, অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে তেলের চাহিদা কমে যেতে পারে, আর সেটিই হতে পারে দাম কমার একমাত্র উপায়।
তবে বিশ্লেষকদের সতর্কতা, যুদ্ধ শেষ হলেও দ্রুত স্বস্তি ফিরবে না। হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি অবকাঠামো মেরামতের ওপরই ভবিষ্যৎ বাজার নির্ভর করবে। উদাহরণ হিসেবে কাতারের রাস লাফান গ্যাসক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, যেখানে সাম্প্রতিক হামলার পর সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে।
এদিকে তেলের বাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। এশিয়ার প্রধান সূচকগুলোতে লেনদেন শুরু হয়েছে পতনের মধ্য দিয়ে। জাপানের নিক্কি ২২৫ সূচক প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক নেমেছে প্রায় ৪ শতাংশ।
উল্লেখ্য, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সামরিক উত্তেজনা শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রায় ৭২ ডলার। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। ১৮ মার্চ তা উঠে যায় ১১৯ দশমিক ৫০ ডলারে, যা ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ। অর্থাৎ সংঘাত শুরুর পর তেলের দাম সর্বোচ্চ প্রায় ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

