মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়ছে বৈশ্বিক শিপিং খাতে, যার সরাসরি অভিঘাত এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশের বাণিজ্যে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক জাহাজ উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রবেশে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
কেউ নিরাপদ জলসীমায় অপেক্ষা করছে, আবার কেউ দীর্ঘ বিকল্প পথে চলাচল করছে। এতে পরিবহন সক্ষমতা কমে গেছে এবং জাহাজ ভাড়া দ্রুত বেড়ে উঠছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানির খরচ বৃদ্ধি। তেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় বাংকার ফুয়েলের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি বীমা প্রিমিয়ামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তিনটি উপাদান ভাড়া, জ্বালানি ও বীমা একসঙ্গে বাড়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে কার্যরত শিপিং লাইনগুলো ইতোমধ্যে কনটেইনার ডিটেনশন চার্জ বাড়িয়েছে এবং নতুন করে জরুরি জ্বালানি সারচার্জ (ইএফএস) আরোপ করেছে। ফলে এমন এক সময়ে ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়ছে, যখন বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস ও সরবরাহ বিঘ্নে তারা আগেই চাপের মধ্যে ছিলেন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে লজিস্টিক ব্যয় প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানি ব্যয়ে, রপ্তানিতে লাভ কমবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, শিপিং কোম্পানিগুলো একই সঙ্গে ডিটেনশন চার্জ ও জ্বালানি সারচার্জ বাড়িয়েছে। এতে অপ্রত্যাশিতভাবে খরচ বেড়ে গেছে। এক উদ্যোক্তা জানান, চলতি মাসের শুরুতেই নতুন সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে, যা আগের হিসাবের মধ্যে ছিল না।
ফ্রেইট চার্জের বৃদ্ধিও ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। সাংহাই থেকে ২০ ফুট কনটেইনার আমদানির খরচ ফেব্রুয়ারির ১,৫০০ ডলার থেকে মার্চে বেড়ে ১,৯০০ ডলারে পৌঁছেছে। একইভাবে লস অ্যাঞ্জেলেসে রপ্তানির ক্ষেত্রে ভাড়া ২,৩০০ ডলার থেকে বেড়ে ২,৯০০ ডলার হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই খরচ বেড়েছে প্রায় ২৬ থেকে ২৭ শতাংশ।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে চীন একটি প্রধান উৎস। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৮.৪৪ বিলিয়ন ডলারের কাঁচামাল আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই এসেছে চীন থেকে। ফলে চীন-বাংলাদেশ রুটে খরচ বাড়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে এই খাতে।
দেশে বর্তমানে ২০টির বেশি আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে বড় কয়েকটি কোম্পানি বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত সিদ্ধান্তেই খরচের এই ঊর্ধ্বগতি স্পষ্ট হচ্ছে।
বাড়তি খরচের কারণে অনেক আমদানিকারক এখন নতুন অর্ডার দেওয়া থেকে বিরত থাকছেন। এক শীর্ষ আমদানিকারক জানান, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর পর থেকেই তারা আমদানি স্থগিত রেখেছেন। তার ভাষায়, পরিবহন খরচ ও পণ্যের দামের অস্থিরতায় বাজারে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি সারচার্জে বাড়তি চাপ
আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের বাড়তি ব্যয় গ্রাহকদের ওপর স্থানান্তর করছে। বিভিন্ন রুটে নতুন জ্বালানি সারচার্জ চালু হয়েছে। এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার রুটগুলোতে এই চার্জ কার্যকর হয়েছে।
নতুন হারে ২০ ফুট কনটেইনারে কয়েকশ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ যোগ হচ্ছে। রেফ্রিজারেটেড কনটেইনারে এ ব্যয় আরও বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাই এর মূল কারণ।
ডিটেনশন চার্জেও ঊর্ধ্বগতি
ডিটেনশন ও ডেমারেজ চার্জও বাড়িয়েছে প্রায় সব শিপিং লাইন। এপ্রিলের শুরু থেকে বিভিন্ন কনটেইনারে দৈনিক চার্জ ৪ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্রি-টাইম অপরিবর্তিত থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরোলেই বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
তবে এখনো পর্যন্ত ডিটেনশন সারচার্জ পুরোপুরি চালু হয়নি বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে এপ্রিলেই এর পূর্ণ প্রভাব দেখা যেতে পারে।
রপ্তানি প্রতিযোগিতায় চাপ
ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলছেন, লজিস্টিক ব্যয় বাড়লে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ, ক্রেতাদের ওপর বাড়তি খরচ চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ সীমিত।
এক রপ্তানিকারক জানান, ক্রেতারা অতিরিক্ত ফ্রেইট বা ডিটেনশন চার্জ দিতে রাজি নয়। ফলে পুরো খরচই উৎপাদকদের বহন করতে হচ্ছে, যা মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে।
শিপিং কোম্পানির ব্যাখ্যা
শিপিং কোম্পানিগুলো বলছে, এই খরচ বৃদ্ধি অনিবার্য। তাদের দাবি, জ্বালানির দাম ও বীমা প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়াতে দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে, এতে ব্যয় আরও বাড়ছে।
তাদের মতে, বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই চার্জ সমন্বয় করা হয়েছে এবং এটি নিয়মিত নয়, বরং পরিস্থিতিনির্ভর।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কার্যকর লজিস্টিক পরিকল্পনা। বন্দরের জট, কাস্টমস বিলম্ব বা অভ্যন্তরীণ পরিবহন সমস্যার কারণে অতিরিক্ত চার্জের ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে শিপিং খরচ শিগগিরই কমার সম্ভাবনা কম। এতে রপ্তানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

