বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যে নিজস্ব শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারছে না। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সার্কভুক্ত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৬০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি প্রায় এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে দেশের আমদানি ছিল সাড়ে ১০ বিলিয়ন ডলার, অথচ রপ্তানি মাত্র ১.৯ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘একনজরে সার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা-২০২৪-২৫ অর্থবছর’। এতে পাঁচটি প্রধান অর্থনৈতিক সূচকের মাধ্যমে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো–রপ্তানি আয়, আমদানি ব্যয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক ঋণ।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ ও সার্কভুক্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্ক কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সার্ক অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল যথাক্রমে ৮০.২ কোটি, ৮৪.২ কোটি, ১২৬.৫ কোটি এবং ৭৭.৭ কোটি ডলার। দশ বছর আগের তুলনায় ঘাটতি প্রায় দ্বিগুণ, আর ২০ বছর আগের তুলনায় বেড়ে সোয়া চার গুণ।
আঞ্চলিক বাণিজ্যে ভারত নেতৃত্বে, পিছিয়ে বাংলাদেশ:
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর সদস্য দেশের মধ্যে শীর্ষ অর্থনীতি ভারত। এই দেশটির প্রভাবপূর্ণ অবস্থানই পুরো সার্ক বাণিজ্যে দমেছে, যা অঞ্চলের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্কভুক্ত দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের আমদানির ৯১.৪ শতাংশ আসে ভারত থেকে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রপ্তানির ৮৮.৮৩ শতাংশই যায় ভারতের বাজারে।
চার দেশের সঙ্গে বড় বাণিজ্য ঘাটতি:
প্রতিবেদন অনুসারে, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির মূল কারণ এককভাবে ভারত। তবে পাকিস্তান, ভুটান ও আফগানিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশ বাণিজ্যে পিছিয়ে। বিপরীতে নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
- ভারত: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ১৭০ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের পণ্য, আমদানি করেছে ৯৬২ কোটি ৪১ লাখ ডলারের। এককভাবে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ৭৯১ কোটি ৯৩ লাখ ডলার।
- পাকিস্তান: রপ্তানি ৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার, আমদানি ৭৫ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। ঘাটতি ৬৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলার।
- ভুটান: রপ্তানি ১ কোটি ৩৮ লাখ ডলার, আমদানি ৪ কোটি ৪১ লাখ ডলার। ঘাটতি ৩ কোটি ৩ লাখ ডলার।
- আফগানিস্তান: রপ্তানি ১ কোটি ১৩ লাখ ডলার, আমদানি ২ কোটি ১৮ লাখ ডলার। ঘাটতি ১ কোটি ৫ লাখ ডলার।
প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে দেখাচ্ছে, বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে ভারসাম্য রাখতে এখনও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশ এগিয়ে:
সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশ সুফল পাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে নেপালের সঙ্গে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেপালে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৩ কোটি ৪২ লাখ ডলার, যেখানে আমদানি মাত্র ৫৫ লাখ ডলার। ফলে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৮৭ লাখ ডলার।
মালদ্বীপে রপ্তানি ৬১ লাখ ডলার, আমদানি ৩৫ লাখ ডলার। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশ ৭ কোটি ৭৪ লাখ ডলার রপ্তানি করেছে, যেখানে আমদানি ৭ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। দ্বীপদেশটির সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত মাত্র ৮ লাখ ডলার।
মালদ্বীপ থেকে রেমিট্যান্সে চমক:
রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও মালদ্বীপ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সার্ক অঞ্চল থেকে মোট ১৫ কোটি ৭৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এতে মালদ্বীপের অবদান ভারতের চেয়ে বেশি—ভারত থেকে এসেছে মাত্র ১ কোটি ৩১ লাখ ডলার। এই অঞ্চলের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৮৯.৪ শতাংশ এসেছে মালদ্বীপ থেকে।
পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা থেকে রেমিট্যান্সের পরিমাণ নগণ্য (প্রতিটি দেশ থেকে ১০ ডলার বা তার কম)। যদিও ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন সেবা খাতে বহু কর্মী রয়েছেন, কিন্তু এই রেমিট্যান্সের প্রকৃত পরিমাণ দেশগুলো প্রকাশ করে না।
সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ও সেবা খাতে ভারতই শীর্ষ:
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ভারতের প্রাধান্য স্পষ্ট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সার্ক অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আসা ১৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) মধ্যে ১০ কোটি ৫৮ লাখ ডলার এসেছে ভারত থেকে। শ্রীলঙ্কা থেকে এসেছে ৪ কোটি ৯১ লাখ ডলার, পাকিস্তান থেকে ৯১ লাখ ডলার।
সেবা খাতেও ভারত প্রধান। সার্ক দেশগুলোতে বাংলাদেশ ৪৫ কোটি ৩২ লাখ ডলারের সেবা রপ্তানি করেছে, যার ৩৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলার এসেছে ভারত থেকে। এ অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ ২৭৯ কোটি ৪২ লাখ ডলার সেবা আমদানি করেছে। ভারতের পরে শ্রীলঙ্কা সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে, যা ৯ কোটি ১৯ লাখ ডলার।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৩.২ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সার্ক দেশগুলো থেকে নেওয়া ঋণ মাত্র ৭০ কোটি ডলার, মূলত ভারত থেকে। মোট বৈদেশিক ঋণের তুলনায় সার্ক অঞ্চলের ঋণ শুধুমাত্র ৩.৮ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ ঋণের জন্য প্রধানত চীন, বিশ্বব্যাংক এবং এডিবির মতো বৃহত্তর উৎসের ওপর নির্ভরশীল।
ভবিষ্যৎ পথরেখা:
প্রতিবেদন সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সার্ক অঞ্চলের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হলেও তা একেবারেই ভারতকেন্দ্রিক। ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যের বাইরে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ছে, তবে এখনও সম্ভাবনার তুলনায় কম। সার্ক অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ৪.৪ শতাংশ, আমদানি ১৫.৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বাণিজ্য অসামঞ্জস্য কমাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ প্রস্তাব করেছেন:
- রপ্তানি পণ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধি: তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ ও চামড়াজাত পণ্য নেপাল ও শ্রীলঙ্কার বাজারে সম্প্রসারণ।
- শ্রমবাজার সম্প্রসারণ: মালদ্বীপ ও অন্যান্য দেশগুলিতে দক্ষ জনশক্তি পাঠিয়ে রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি।
- ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস: রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান অশুল্ক বাধা দূর করা।
এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে সার্ক অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল হতে পারে।

