দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে মুখ্য ভুমিকা পালন করা রপ্তানি খাত চলতি অর্থবছরে হোঁচট খাচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ৮ মাসে রপ্তানি আয় কমেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে আগের বছরের তুলনায় ১২.০৩ শতাংশ হ্রাসের পর মার্চে আরও নিম্নমুখী হয়ে আয় কমেছে ১৮.০৭ শতাংশ। জুলাইয়ে ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর এই পতন শিল্প খাতের জন্য উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলেন, শিল্পকারখানায় কর্মদিবস কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাকের দাম হ্রাস এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সরবরাহ ব্যাহত করছে। তবে প্রকৃত কারণ হিসেবে তারা বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং দেশে জ্বালানি সংকটকেও উল্লেখ করেন। রপ্তানি কমছে এমন সময়ে, যখন বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) অনুযায়ী, মার্চে রপ্তানি আয় কমে ৩.৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। গত বছর একই সময়ে এই আয় ছিল ৪.২৪ বিলিয়ন ডলার। ফেব্রুয়ারির রপ্তানি আয় ছিল ৩.৫০ বিলিয়ন ডলার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৫.৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৩৭.১৯ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৪.৮৫ শতাংশ কম।
মার্চে পবিত্র ঈদুল ফিতরের কারণে উৎপাদন কার্যক্রমে বিরতি ছিল। কারখানা থেকে বন্দরে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাকের দাম কমে যাওয়ায় রপ্তানি আয় কমেছে।
দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ কারণে এই খাতের পতন পুরো রপ্তানি আয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি আয় ৫.৫১ শতাংশ কমে ২৮.৫৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা আগের বছরের ৩০.২৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় কম। শুধু মার্চে এই খাতের রপ্তানি ১৯ শতাংশের বেশি কমে ২.৭৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর সেখানে ক্রয়াদেশ কমেছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজারেও অর্ডার কমেছে। চীনা রপ্তানিকারকরা কম দামে পণ্য সরবরাহ করে ইউরোপের বাজারে বড় অংশ দখল করায় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “এই খাত অতীতে এত দীর্ঘ সময় চাপের মধ্যে ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি মিলিয়ে রপ্তানি পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, ডিজেলের ঘাটতি উৎপাদন ব্যাহত করছে।” ইপিবির বিশ্লেষণও বৈশ্বিক পরিস্থিতির একই প্রভাব তুলে ধরেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিতে। অতিরিক্ত জাহাজ ভাড়া দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে সীমিত পরিসরে পণ্য পাঠানো শুরু হয়েছে। অন্যান্য খাতের চিত্র মিশ্র। মার্চে সিমেন্ট ও কেমিক্যাল পণ্যের রপ্তানি ১৮ শতাংশ, চামড়া খাত ৬.৯৭ শতাংশ কমেছে, কৃষিপণ্যে সামান্য হ্রাস দেখা গেছে। তবে প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। হিমায়িত মাছ, চামড়া ও প্রকৌশল পণ্য খাতে কিছু ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক পতনকে আংশিকভাবে সামলাচ্ছে।

