মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব এসে পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং দাম বাড়ার চাপ সব মিলিয়ে চাপে রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
এর মধ্যেই সরকার স্পট মার্কেট থেকে ৭ লাখ টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দিয়েছে। তবে বাস্তবে সেই জ্বালানি হাতে পাওয়া নিয়ে এখনো রয়ে গেছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অনুমোদনের পরও মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে ‘পারফরম্যান্স গ্যারান্টি’ (পিজি) জমা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে। নিয়ম অনুযায়ী, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে আগে পিজি দিতে হয়, এরপরই চুক্তি ও এলসি খোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু অধিকাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এখনো পিজি জমা দেয়নি। ফলে জ্বালানি আমদানির পুরো প্রক্রিয়াই আটকে আছে।
স্পট মার্কেটে কেনাকাটা, কিন্তু গতি নেই সরবরাহে:
সরকার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে তাতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগের সুপারিশের ভিত্তিতে অর্থবিভাগ অনুমোদন দিলেও প্রায় সোয়া আট লাখ টন জ্বালানি সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ডিজেল ও অকটেন সরবরাহের জন্য ‘নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়েছে। তবে এর বিপরীতে কার্যকর অগ্রগতি সীমিত। ২৫ হাজার টন অকটেন সরবরাহের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান পিজি জমা দিলেও ডিজেলের ক্ষেত্রে এখনো কেউ এগিয়ে আসেনি।
আন্তর্জাতিক সংঘাতের সরাসরি প্রভাব:
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ এবং পাল্টা উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। এক পর্যায়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বড় ধরনের বিঘ্নের মুখে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও।
এই পরিস্থিতিতে দেশে সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় শুরু হয় জ্বালানি তেলের অতিরিক্ত কেনাকাটা বা ‘প্যানিক বায়িং’। এতে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ধরে রাখতে বিপিসিকে বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন:
স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কেনার ঘোষণার পর দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানি ২ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। পাশাপাশি দুবাইভিত্তিক আরেকটি প্রতিষ্ঠান ১ লাখ টন ডিজেল ও ২৫ হাজার টন অকটেন সরবরাহে আগ্রহ দেখায়।
পরবর্তীতে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল কেনার অনুমোদন দেয় সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। ধাপে ধাপে মোট ৭ লাখ টনের বেশি ডিজেল ও অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে অনুমোদনের পর বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নির্ধারিত সময় পার হলেও ডিজেল সরবরাহের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান পিজি জমা দেয়নি। শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অকটেন সরবরাহের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনো চুক্তি সম্পন্ন হয়নি।
পিজি জটিলতায় থমকে আছে আমদানি:
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, পিজি ছাড়া চুক্তি করা সম্ভব নয়। আর চুক্তি ছাড়া এলসি খোলা যায় না। ফলে জ্বালানি আমদানির পুরো প্রক্রিয়াই অনিশ্চয়তায় আটকে আছে।
একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের সময়ে কঠোর নিয়ম কিছুটা শিথিল না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাদের মতে, জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প উপায়ে দ্রুত জ্বালানি আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এপ্রিলের আমদানি লক্ষ্য:
চলতি এপ্রিল মাসে বিপিসি ৩ লাখ ২৩ হাজার টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। নিয়মিত সরবরাহকারীদের পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও দ্রুত জ্বালানি আনার চেষ্টা চলছে।
ইতোমধ্যে কিছু সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। মার্চ মাসে একটি রিফাইনারি থেকে ২৫ হাজার টন ডিজেল পাওয়া গেছে। এছাড়া একাধিক পার্সেলের প্রতিশ্রুতি মিলেছে, যার মধ্যে কয়েকটি ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে।
সব মিলিয়ে অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, সরবরাহকারীদের অনীহা এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতা এই তিনের সমন্বয়ে পরিস্থিতি অনিশ্চিত রয়ে গেছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জ্বালানি সরবরাহে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

