ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্পে। জ্বালানি তেল ও পলিমার রেজিনের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় দেশের বাজারে প্লাস্টিকের কাঁচামালের মূল্য প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার পথে। এতে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার ছোট-বড় উদ্যোক্তা।
প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারীদের মতে, পিভিসি, পিপিআর, এইচডিপিই রেজিন এবং জিআই ফিটিংসের জন্য স্টিল শিট ও গ্যালভানাইজড উপকরণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। এসবের বড় অংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরান থেকে। তুরস্ক থেকেও কিছু কাঁচামাল আসে। চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সীমিত পরিমাণে সরবরাহ আসলেও তা দেশের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কাঁচামাল আসা বন্ধ হওয়ার পথে।
বাংলাদেশে প্লাস্টিক ও জিআই ফিটিংস শিল্পের বাজারের আকার প্রায় ৬,৫০০ থেকে ৭,০০০ কোটি টাকার মধ্যে, যেখানে শতাধিক কারখানা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই খাত দেশের নির্মাণশিল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। আবাসন, অবকাঠামো উন্নয়ন, পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ, গ্যাস সংযোগ এবং কৃষি, সেচ—এসব ক্ষেত্রেই এই পণ্যগুলোর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। দেশের প্রায় ৩০ হাজার গার্মেন্টসও প্যাকেজিংসহ নানা ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ওপর নির্ভরশীল।
খাতে কর্মীসংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। আমদানিকারকরা জানাচ্ছেন, আগে যেখানে এলসি খোলার তিন-চার সপ্তাহের মধ্যে পণ্য পৌঁছাত, এখন তা পৌঁছাতে সাত-আট সপ্তাহ লাগছে। যুদ্ধের প্রভাবে গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে প্লাস্টিকের কাঁচামালের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের পর বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত সেই ইতিবাচক ধারা ব্যাহত করছে এবং শিল্প খাতকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
যুদ্ধের আগে এক টন প্লাস্টিকের দাম ছিল ৮০০–৯৫০ ডলার। বর্তমানে তা এক হাজার ৫০০–১,৮০০ ডলারে পৌঁছেছে। এ ছাড়া শিপিং খরচও প্রতি টনে ৫০–১০০ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। কাঁচামালের সংকটে অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, খুচরা পর্যায়ে প্লাস্টিক পণ্যের দাম বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে। ছোট-বড় অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
রাজধানীর কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ‘ইমপেরিয়াল প্লাস্টিক লিমিটেড’-এর মালিক কে এম ইকবাল হোসাইন বলেন, “২৫ কেজির প্লাস্টিকের দাম আগে ছিল তিন হাজার টাকা, এখন হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার। এই দামে বিক্রি করলে লোকসান হবে। তাই আপাতত কারখানাটি বন্ধ রেখেছি। তবে শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে।”
অন্যদিকে, লুনা পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এ এস এম কামাল উদ্দিন বলেন, “আমরা সবকিছু মিলিয়ে ৩০–৩২ শতাংশ ভ্যাট ও শুল্ক দিচ্ছি। পণ্য যখন বন্দরে আসে, তা খালাসের জন্য অতিরিক্ত ফি দিতে হয়। এভাবে খরচ প্রায় দিগুণ হয়ে যায়। এর ফলে শিল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে।”

