দেশের বৈদেশিক লেনদেনের চিত্রে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বাণিজ্য ঘাটতির বিস্তার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে এ ঘাটতি ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে। আমদানি বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয়ের হ্রাস—এই দুইয়ের যৌথ প্রভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৬.৯১ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৩.৭১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে ৩.২০ বিলিয়ন ডলার।
একই সময়ে রপ্তানি আয়ে দেখা গেছে সংকোচন। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি আয় কমে দাঁড়িয়েছে ২৯.২৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ৩০.০৩ বিলিয়ন ডলার। শতাংশের হিসাবে এ হ্রাস ৩.১৫। অর্থনীতিবিদদের মতে, তৈরি পোশাক খাতে দুর্বলতা এবং ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানির গতি কমে যাওয়াই এ পতনের প্রধান কারণ।
অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে আমদানি হয়েছে ৪৬.১৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৫.৬০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যপণ্য ও সারের আমদানি বৃদ্ধি এ প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, আমদানি বাড়লেও রপ্তানি প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে দুইয়ের ব্যবধান থেকেই বাণিজ্য ঘাটতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, খাদ্যপণ্য ও সারের আগাম আমদানি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
তবে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি নেমে এসেছে ১ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এটি ছিল প্রায় ১.৪৭ বিলিয়ন ডলার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। আলোচ্য সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২২.৪৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৮.৪৯ বিলিয়ন ডলার। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণেই বাণিজ্য ঘাটতির চাপ সত্ত্বেও চলতি হিসাব নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
জাহিদ হোসেনের ভাষায়, বাণিজ্য ঘাটতি ১৭ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছালেও রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি সীমিত রাখা গেছে। অন্যথায় এ ঘাটতি আরও বড় হতে পারত।
অন্যদিকে আর্থিক হিসাবেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪.০৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রেড ক্রেডিট বৃদ্ধিই এ উন্নতির প্রধান কারণ। এ সময়ে ট্রেড ক্রেডিট দাঁড়িয়েছে ২.৫৬ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের বছর এটি ছিল ঋণাত্মক ১.১২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আগের রপ্তানির বকেয়া অর্থ দেশে ফেরত এসেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, আর্থিক হিসাবের ইতিবাচক অবস্থান দেশের জন্য স্বস্তির বার্তা। তবে এ ধরনের প্রবাহ ভবিষ্যতে পরিশোধযোগ্য দায় তৈরি করে, সেটিও মাথায় রাখতে হবে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, রপ্তানি দুর্বলতা ও আমদানি বৃদ্ধির কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও রেমিট্যান্স ও ট্রেড ক্রেডিটের কারণে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি কিছুটা ভারসাম্যে রয়েছে।

