মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শিপিং খাতে। এতে অস্থির হয়ে উঠেছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। বেড়েছে জাহাজ ভাড়া, কমেছে কনটেইনারের প্রাপ্যতা। একই সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে পণ্যের পরিবহন সময়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতে।
ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় অনেক শিপিং লাইন বিকল্প রুট ব্যবহার করছে। এতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে গেছে। এর পাশাপাশি কনটেইনার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অনেক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে আমদানি করা কাঁচামাল আটকে পড়ছে। আবার রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় জাহাজও সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানি উভয় খাতেই চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পচনশীল ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, কেমিক্যাল ও পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক কাঁচামাল রপ্তানি ও আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। শিপিং লাইনগুলোর অনীহার কারণে মধ্যপ্রাচ্য রুটে জাহাজ চলাচল কমে গেছে। ফলে পরিবহন ব্যয় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামভিত্তিক মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সুফিয়ান চৌধুরী জানান, আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামাল আনতে যেখানে প্রায় ৭৫০ ডলার ভাড়া লাগত, এখন তা বেড়ে প্রায় ১০০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। চীন থেকে কনটেইনার আনতে আগে ১১০০ ডলার লাগলেও এখন প্রায় ১৫০০ ডলার খরচ হচ্ছে। একই সঙ্গে কনটেইনার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চিফ সাপ্লাই চেইন অফিসার তানজির হেলাল বলেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে কনটেইনার ভাড়া অনেক বেড়েছে। থাইল্যান্ড থেকে আগে ৯০০ ডলার এবং সিঙ্গাপুর থেকে ৬০০ ডলারে কনটেইনার আনা যেত, এখন তা প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। তিনি আরও জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক জাহাজ কনটেইনার নিয়ে প্রবেশ করলেও আর বের হতে পারেনি। এতে বিশ্বব্যাপী কনটেইনার সংকট তৈরি হয়েছে।
শিপিং লাইনগুলোর লিড টাইমও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাহাজ আসতে গড়ে ৫০ দিন লাগত, এখন তা ৭০ দিনেও পৌঁছাচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে পণ্য আটকে থাকার সময় ১০ দিন থেকে বেড়ে প্রায় ২০ দিন হয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের বিলম্ব তৈরি হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রপ্তানিমুখী খাদ্যপণ্য ও ফ্রেশ ফুড খাত। চট্টগ্রাম ফ্রেশ ফুডস অ্যান্ড ভেজিটেবল এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব রানা জানান, আগে এয়ার ফ্রেইটের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২৫ টন পণ্য দুবাই, শারজাহ ও জেদ্দায় পাঠানো হতো। এখন ফ্লাইট বাতিল ও সংকটের কারণে প্রতিদিন ২৫ হাজার ডলারের বেশি রপ্তানি আয় কমে যাচ্ছে।
হিফস অ্যাগ্রোর স্বত্বাধিকারী এবং বাপার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মো. শোয়াইব হাসান জানান, তার প্রতিষ্ঠানের ১০টি কনটেইনার বর্তমানে রপ্তানিপণ্য নিয়ে পথে রয়েছে। এর মধ্যে ৬টির অবস্থান জানা গেলেও বাকি ৪টির বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যের রুটে শিপিং লাইনগুলো ঝুঁকি বিবেচনায় প্রতি কনটেইনারে প্রায় ৩০০০ ডলার অতিরিক্ত চার্জ নিচ্ছে। বিকল্প রুট ব্যবহার করলে অতিরিক্ত খরচ আরও বাড়ছে।
অনেক ক্ষেত্রে কলম্বো হয়ে জেদ্দা পোর্ট ব্যবহার করে সড়কপথে দুবাইয়ে পণ্য পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে। এতে প্রতি কনটেইনারে অতিরিক্ত প্রায় ১৫০০ ডলার খরচ যোগ হচ্ছে। ফলে প্রতি কার্টনে গড়ে তিন ডলারের মতো ব্যয় বাড়ছে।
স্মার্ট গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান জানান, বৈশ্বিক শিপিং সেক্টর এখন বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে জাহাজ না পাওয়ায় কেমিক্যালসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। অনেক রুটে সময়মতো শিডিউল মিলছে না এবং ভাড়া প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তিনি আরও জানান, কিছু পণ্য ডিপোতে থাকলেও শিপমেন্ট না হওয়ায় অনেক রপ্তানিকারক সেগুলো ফেরত নিতে বাধ্য হচ্ছেন, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ক্ষতি বেশি।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক শাহেদ সারোয়ার জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে শিপিং লাইনগুলো বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ করে। পরে জ্বালানির দাম কমলেও সমন্বয় সময়সাপেক্ষ হয়। তিনি আরও বলেন, দূরত্ব ও বিকল্প রুট ব্যবহারের কারণে শিপিং খরচ স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে এলপিজি ও এলএনজি আমদানিও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। দূরবর্তী রুট ব্যবহার করতে হওয়ায় পরিবহন খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে, যা পুরো জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে বৈশ্বিক শিপিং ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখন বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে। কনটেইনার সংকট, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ শিপমেন্ট সময়—সব মিলিয়ে চাপেই মধ্যেই দিন যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

