দেশের তৈরি পোশাক খাত এখন বড় ধরনের চাপের মুখে। প্রধান দুই বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রপ্তানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই এই পতনের স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২৮.৫৮ বিলিয়ন ডলার। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৫১ শতাংশ কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট এবং বাজারের চাহিদা পরিবর্তনের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে। দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৪৯ শতাংশ যায় এই অঞ্চলে। সেখানে রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.২ বিলিয়ন ডলারে। ইউরোপে ভোক্তাদের ব্যয় কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধারা লক্ষ্য করা গেছে। এই বাজারে রপ্তানি নেমে এসেছে ৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারে। যদিও বাজারটি তুলনামূলক স্থিতিশীল, তবুও ক্রেতাদের চাহিদায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের বাজারেও সামান্য পতন হয়েছে, রপ্তানি কমেছে ১.৬১ শতাংশ। অন্যদিকে কানাডায় পরিস্থিতি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
শুধু বড় বাজারেই নয়, নতুন বা অপ্রচলিত বাজারেও ধাক্কা লেগেছে। এসব বাজারে রপ্তানি কমেছে ৮.০৫ শতাংশ। এতে বোঝা যাচ্ছে, বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তন পুরো রপ্তানি খাতকে প্রভাবিত করছে।
পণ্যের ধরনেও পরিবর্তনের আভাস মিলছে। নিটওয়্যার রপ্তানি কমেছে ৬.৪২ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকে কমেছে ৪.৪৮ শতাংশ। উদ্যোক্তারা বলছেন, এখন উচ্চমূল্যের পণ্য, নতুন নকশা এবং বৈচিত্র্যময় উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
এই খাতের গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক থেকে। ফলে এ খাতে ধস নামলে সামগ্রিক রপ্তানিতেও প্রভাব পড়ে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩ হাজার ৫৩৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৪.৮৫ শতাংশ কম। গত বছর এই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৩ হাজার ৭১৯ কোটি ডলার।
রপ্তানি কমার পেছনে আরও কিছু তাৎক্ষণিক কারণও রয়েছে। গত মাসে ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিতে কারখানাগুলো ৮ থেকে ১০ দিন বন্ধ থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে সময়মতো পণ্য বন্দরে পাঠানো যায়নি, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রপ্তানিতে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে ক্রয়াদেশ কমছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রভাবও পুরোপুরি কাটেনি, যা ক্রয়াদেশ কমার একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিযোগিতার দিক থেকেও চাপ বাড়ছে। চীন কম দামে ইউরোপের বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়িয়েছে। ফলে মূল্য প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, জ্বালানি সংকট এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ডিজেলের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তারা শিল্পে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন।
অন্যদিকে তরুণ উদ্যোক্তারা এই পরিস্থিতিকে পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এখন শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ করলেই হবে না। গুণগত মান, টেকসই উৎপাদন এবং নতুন ডিজাইনের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তি উন্নয়ন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার খোঁজার বিকল্প নেই। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাজার বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে উঠেছে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও উদ্যোক্তাদের আশা, সঠিক কৌশল গ্রহণ করা গেলে তৈরি পোশাক খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

