দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমদানির তুলনায় রপ্তানি আয়ের দুর্বল প্রবৃদ্ধি বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সর্বশেষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালান্স অব পেমেন্ট প্রতিবেদনে এই চিত্র আরও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি শেষে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি এক মাসেই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জানুয়ারি শেষে যেখানে ঘাটতি ছিল ১৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক মাসে ঘাটতি বেড়েছে ৩ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি।
এই ঘাটতির মূল কারণ হিসেবে আমদানি ও রপ্তানির বড় ব্যবধানকে সামনে আনছেন সংশ্লিষ্টরা। আট মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে ২৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যবধানই বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও গভীর করেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি বৃদ্ধির পেছনে একদিকে রয়েছে মৌসুমি চাহিদা, অন্যদিকে কাঠামোগত চাপ। রমজানকে কেন্দ্র করে খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বেড়েছে। পাশাপাশি শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানিতেও কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে।
অন্যদিকে রপ্তানি খাত প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তা ব্যয় হ্রাস পাওয়ায় তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের অর্ডার কমে গেছে। ফলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতেও প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “রপ্তানি আয়ের বড় অংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। এই খাতে অর্ডার কমে গেলে সামগ্রিক রপ্তানিতেও তার প্রভাব পড়ে।” তিনি আরও জানান, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি শিল্প খাতের সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
তবে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত মার্চ মাসে দেশে এসেছে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা একক মাসে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এটি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। রমজান ও ঈদকে ঘিরে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এই প্রবাহ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবুও এই উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ বাণিজ্য ঘাটতির চাপ পুরোপুরি সামাল দিতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রপ্তানির ধীরগতি ও আমদানির চাপ মিলেই বৈদেশিক হিসাবকে অস্থির করে তুলছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, “চলমান আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব সামনে আরও বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।” তিনি আরও সতর্ক করেন, এ পরিস্থিতিতে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণে সতর্ক নীতি গ্রহণ জরুরি।
তবে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আর্থিক হিসাবে ৪ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ০.৪৩৫ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যেও উন্নতি দেখা গেছে। জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে সামগ্রিক ভারসাম্যে ৩ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি।
সব মিলিয়ে রপ্তানি-আমদানি ভারসাম্যের চাপ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি—সবকিছু মিলিয়ে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য পরিস্থিতি এখন এক জটিল সমীকরণের মধ্যে রয়েছে।

