বাংলাদেশে শ্রম আইন সংশোধন ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধনীতে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা কমানো থেকে শুরু করে শ্রমিকের সংজ্ঞা পরিবর্তন—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এতে শ্রমিক ও মালিক—উভয় পক্ষের প্রতিক্রিয়ায় দেখা দিয়েছে ভিন্নমত।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল পাস করে সরকার। এর আগে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ–২০২৫-এ কিছু পরিবর্তন এনে বিলটি চূড়ান্ত করা হয়। এখন রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলেই এটি আইনে পরিণত হবে।
নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানপুঞ্জে সর্বোচ্চ ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা পাঁচ থেকে কমিয়ে তিনে নামানো হয়েছে। আগে এই সীমা তিনটিই ছিল, পরে তা বাড়িয়ে পাঁচ করা হয়েছিল। এখন আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া হলো। একাধিক ইউনিয়ন থাকলে গোপন ব্যালটে ভোটের মাধ্যমে যৌথ দর-কষাকষির প্রতিনিধি (সিবিএ) নির্ধারণের বিধান বহাল রয়েছে। আর একটি ইউনিয়ন থাকলে সেটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিবিএ হিসেবে গণ্য হবে।
শ্রমিকের সংজ্ঞাতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। পূর্ববর্তী অধ্যাদেশে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শ্রমিকের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, নতুন বিলে সেই দুটি শব্দ বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে শ্রমিকের পরিধি আবার সংকুচিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভবিষ্য তহবিল বা প্রভিডেন্ট ফান্ড নিয়েও আনা হয়েছে নতুন বিধান। আগে ১০০ বা তার বেশি স্থায়ী শ্রমিক থাকলে প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে তহবিল গঠন করতে হতো। পাশাপাশি কর্মীদের জন্য জাতীয় পেনশন স্কিম ‘প্রগতি’ চালুর কথাও ছিল। তবে সংশোধিত বিলে বলা হয়েছে, যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের দুই-তৃতীয়াংশ কর্মী ‘প্রগতি’ স্কিমে যুক্ত হতে লিখিত আবেদন করেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি প্রভিডেন্ট ফান্ড গঠন থেকে অব্যাহতি পাবে। উভয় ক্ষেত্রেই মালিক ও শ্রমিকের চাঁদার অনুপাত অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে আরও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যা নতুন বিলে বহাল রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, তিন বছর অন্তর মজুরি বোর্ড গঠন, মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন এবং বার্ষিক উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৩ দিন করা।
তবে এই সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে শ্রমিকপক্ষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। একাধিক শ্রমিকনেতার দাবি, মালিকপক্ষের চাহিদা অনুযায়ীই আইনটি সংশোধন করা হয়েছে। ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (টিসিসি)-এর বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলেও তারা অভিযোগ করেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে টিসিসির আলোচনার মাধ্যমে যে সংশোধনগুলো চূড়ান্ত হয়েছিল, তা হঠাৎ করেই পরিবর্তন করা হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর আপত্তি উপেক্ষা করে এই পরিবর্তন আনা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রক্রিয়ার পরিপন্থী বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে মালিকপক্ষও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, টিসিসির ঐকমত্যের ভিত্তিতে আইন সংশোধন হওয়া উচিত ছিল। যদিও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, তবুও আইনে এখনো কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে শ্রম বিধিমালার মাধ্যমে এসব বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সংশোধনী আনার আগে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ১৪৪-এর পরিপন্থী। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদেও বিলটি নিয়ে বিরোধী দলের কোনো আলোচনা হয়নি বলে দাবি করা হয়।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বলেন, আইন সংশোধনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর বাস্তবায়ন। কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে শ্রমিকরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হবেন।

