মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উৎস থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি কার্যক্রমে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে করে আগামী মাসগুলোর জ্বালানি সরবরাহ পরিকল্পনায় চাপ বাড়ছে পেট্রোবাংলার ওপর।
এই সংকট সামাল দিতে আগামী মে মাসের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও অ্যাঙ্গোলা থেকে তিনটি এলএনজি কার্গো আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় এসব কার্গো সরবরাহ করবে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা। বিষয়টি ইতোমধ্যে পেট্রোবাংলাকে নিশ্চিত করা হয়েছে বলে সংস্থাটির সূত্র জানিয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি দ্বিতীয় চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসি (কিউইটিএল) আগামী ১৭ মে একটি কার্গো সরবরাহ করবে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি ১ মে একটি কার্গো পাঠাবে। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আরামকো ট্রেডিং (সিঙ্গাপুরভিত্তিক) ৩১ মে আরেকটি কার্গো সরবরাহ করবে।
সংস্থাটির হিসাবে, মে মাসে মোট ১১টি এলএনজি কার্গোর প্রয়োজন হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় থাকা কাতার ও ওমান থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে এরই মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে পাঁচটি কার্গো কেনা নিশ্চিত করেছে পেট্রোবাংলা। যুক্তরাষ্ট্র ও অ্যাঙ্গোলা থেকে আসছে তিনটি কার্গো। বাকি তিনটি কার্গোর বিষয়ে এখনো সরবরাহকারীদের কাছ থেকে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। এসব কার্গো না এলে সেগুলোও স্পট মার্কেট থেকে কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, মে মাসের জন্য পাঁচটি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আরও তিনটি কার্গো আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাকি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেটেই যেতে হবে। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে স্পট মার্কেটে দাম কিছুটা কমতির দিকে থাকায় এটি একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠছে।
কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসির সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি দ্বিতীয় চুক্তি হয় ২০২৩ সালের ১ জুন। এই চুক্তির আওতায় চলতি বছরে মোট ১২টি কার্গো সরবরাহের কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে ২০৪০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ কাতার থেকে এলএনজি পাবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট গ্যাস মার্কেটিং লিমিটেডের সঙ্গে ২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর ১৫ বছর মেয়াদি আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। এই চুক্তির আওতায় প্রতি বছর প্রায় ১ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহের কথা রয়েছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য পেট্রোবাংলা মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ৫৬টি কার্গো আসার কথা কাতার ও ওমান থেকে। বাকি অংশ স্পট মার্কেট ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতির কারণে কাতার এনার্জির এলএনজি স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তারা সরবরাহে “ফোর্স মেজর” ঘোষণা করে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নির্ধারিত কার্গোগুলোও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। ফোর্স মেজর সাধারণত যুদ্ধ, দুর্যোগ বা মহামারির মতো অপ্রতিরোধ্য কারণে চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার একটি আইনি ব্যবস্থা।
এদিকে সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প দেশ থেকে এলএনজি সরবরাহের চেষ্টা করছে কাতার এনার্জি। পাশাপাশি বাংলাদেশও বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি উৎস থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ইতোমধ্যে ২১ মে পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। বাকি কার্গো না এলে সেগুলোও স্পট মার্কেট থেকে সংগ্রহ করা হবে বলে তিনি জানান।
অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে পেট্রোবাংলার এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হবে প্রায় ৫১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। শুরুতে ভর্তুকি ধরা হয়েছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই ব্যয় বেড়ে অতিরিক্ত প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে। ফলে মোট ভর্তুকি ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে গ্যাস আমদানি ও দেশীয় গ্যাস মিশিয়ে বিক্রির ফলে পেট্রোবাংলার গড় সরবরাহমূল্য বেড়ে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৩২ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে ভোক্তা পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে গড়ে ২২ টাকার কিছু বেশি দামে। ফলে প্রতি ইউনিটে বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনায় প্রতি এমএমবিটিইউতে গড়ে ১০ ডলারের কিছু বেশি খরচ হতো। বর্তমানে সেই খরচ বেড়ে গড়ে ২০ ডলার ৬৯ সেন্টে পৌঁছেছে, যা প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। সব মিলিয়ে বৈশ্বিক সংঘাত ও সরবরাহ সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, আর সেই চাপ সামলাতে পেট্রোবাংলাকে এখন ব্যয়বহুল বিকল্প বাজারের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।

