২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের পতন হয়েছে। এ সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২৫ সালের একই সময়ের ৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ইউরো থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ইউরোতে। এ সময় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল।
এই তথ্য প্রকাশ করেছে ইউরোস্ট্যাট। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, শুধু রপ্তানি আয়ই নয়, বাংলাদেশি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ইইউ বাজারে প্রতি কেজিতে গড় রপ্তানি মূল্য ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৪ ইউরোতে। আগের বছর একই সময়ে এই মূল্য ছিল ১৫ দশমিক ৪৫ ইউরো।
ইউরোস্ট্যাটের হিসাব বলছে, আলোচ্য সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমে ১৩ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে। এই পতনের পেছনে পোশাক আমদানির পরিমাণ ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ কমে যাওয়ার প্রভাব রয়েছে।
প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পতন হয়েছে শুধু তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার। তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ২২ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ২১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানিও কমেছে ১৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
অন্যদিকে চীন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির রপ্তানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ১ শতাংশ। ভিয়েতনাম সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থেকে রপ্তানি পতন সীমিত রাখতে সক্ষম হয়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ট্রাম্পের শুল্কের প্রভাব এড়াতে একাধিক প্রতিযোগী দেশ ও সরবরাহকারী এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারমুখী হয়েছে। এতে ইইউ বাজারে সরবরাহ ও প্রতিযোগিতার চাপ বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতির কারণে ইইউ ক্রেতারা অর্ডার কমাচ্ছে। দেশে উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং নীতিগত অস্থিরতা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল করেছে। ফলে রপ্তানির পরিমাণ ও মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই পতন ঘটছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ। যেখানে বৈশ্বিক গড় পতন ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। এতে স্পষ্ট হয়, শুধু দাম কমেনি, বরং ক্রয়াদেশও কমেছে। এদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও চীন রপ্তানির পরিমাণ ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান কম দামে পণ্য বিক্রি করে রপ্তানির পরিমাণ ২২ দশমিক ৩৯ শতাংশ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ কমে ১৪ দশমিক ৪ ইউরোতে নেমে এসেছে। এই পতন বৈশ্বিক গড় হ্রাসের তুলনায় বেশি। চীনের ইউনিট মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ২৭ শতাংশ, ভারতের ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মরক্কোর ১ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় তুলনামূলক বেশি মূল্য পতন দেখা গেছে। পাকিস্তানের ইউনিট মূল্য কমেছে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। তবে কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ আবার ইউনিট মূল্য বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ভিয়েতনামের মূল্য বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ, তুরস্কের ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ।
বাংলাদেশের গড় রপ্তানি মূল্য এখন ভিয়েতনাম (২৯ দশমিক ৮২ ইউরো), তুরস্ক (২৮ দশমিক ১৯ ইউরো), মরক্কো (৩০ দশমিক ২৮ ইউরো) এবং শ্রীলঙ্কার (২৪ দশমিক ৪৪ ইউরো) তুলনায় অনেক কম। অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকদের মতে, বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাসের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাও এই পতনের জন্য দায়ী।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাত এখনো কম দামের বেসিক পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো উচ্চমূল্য ও বৈচিত্র্যময় পণ্যে জোর দিচ্ছে। ফলে তারা সংকটের মধ্যেও ইউনিট মূল্য ধরে রাখতে বা বাড়াতে পারছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, ইইউতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের কারণে অর্ডার কমছে। পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, শুধু কম শ্রমমূল্যের সুবিধার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। তার মতে, ভবিষ্যতে উচ্চমূল্যের পোশাক, কৃত্রিম আঁশভিত্তিক পণ্য, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিং সক্ষমতা বাড়ানো এবং উৎপাদন দক্ষতা উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

