চট্টগ্রাম বন্দরে ডিজেল সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করায় লাইটার জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে বহির্নোঙরে থাকা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের সার্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায়, তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার আশঙ্কা।
লাইটার জাহাজ চলাচলে অচলাবস্থা:
ডিজেল সংকটের কারণে লাইটার জাহাজগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। ফলে বহির্নোঙর থেকে বন্দরে পণ্য আনা-নেওয়া প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। সাধারণত যেখানে পণ্য খালাস সম্পন্ন হতে ১৫ দিন সময় লাগে, সেখানে এখন তা বেড়ে প্রায় এক মাসে দাঁড়িয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রতায় আমদানিকারকদের প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৩ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ চার্জ গুনতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই চাপ সৃষ্টি করবে।
বর্তমানে বহির্নোঙরে প্রায় ৮০টি বড় জাহাজ অপেক্ষায় রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ক্লিংকার, খাদ্যশস্য ও পোল্ট্রি ফিড রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে, ৫০,৮৬৮ টন সয়াবিন বীজ নিয়ে আসা ‘এমভি জিএম ফরচুন’ ১৬ মার্চ থেকে বহির্নোঙরে অবস্থান করছে। এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জাহাজটিতে এখনো প্রায় ২,৯০০ টন পণ্য রয়ে গেছে। ফলে এর খালাস সময় বেড়ে ৩২ দিনে দাঁড়িয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের প্রায় দ্বিগুণ।
ডিজেল সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে কয়লা পরিবহন ও খালাসে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা আনার লাইটার জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে আগে ৩২ থেকে ৩৮ ঘণ্টায় কয়লা পরিবহন শেষ হতো, এখন তা ৮ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত সময় নিচ্ছে। ফলে জাহাজজট আরও তীব্র হয়েছে।
একটি লজিস্টিক কোম্পানির কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিদিন ৮ থেকে ১০টি লাইটার জাহাজ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩ থেকে ৪টি। এতে গত দুই সপ্তাহে কয়লা পরিবহন কার্যক্রম বড় ধরনের ধীরগতিতে পড়েছে।
অলস জাহাজে বিপুল লোকসান:
জ্বালানি সংকটে বহু জাহাজ অলস পড়ে থাকায় মালিকদের বড় অঙ্কের লোকসান হচ্ছে। শিপিং খাতের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি বড় জাহাজ অলস অবস্থায় থাকলে দিনে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে।
নাবিল গ্রুপের শিপিং শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক সাইফুল আলম জানান, তাদের ৯টি জাহাজ বর্তমানে বহির্নোঙরে আটকে আছে। তিনি বলেন, প্রতিদিন অন্তত ১৮টি লাইটার জাহাজ প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১০টি। অনেক সময় জ্বালানির ঘাটতির কারণে সেগুলোও সময়মতো পৌঁছায় না। তার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি জাহাজে প্রতিদিন গড়ে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে।
এএনজে ট্রেডিংয়ের মালিক জাহাঙ্গীর আলম জানান, ২ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে তাদের ৬০টি জাহাজ বরাদ্দ থাকলেও ১ লাখ ৫০ হাজার লিটারের চাহিদার বিপরীতে তারা পেয়েছেন মাত্র ৫০ হাজার লিটার ডিজেল। অন্যদিকে জাহাজ চলাচলে জ্বালানি বরাদ্দ পর্যাপ্ত না হওয়ায় কার্যক্রম আরও ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, আগে প্রতিদিন সমন্বয় সভা হলেও এখন তা ৩ থেকে ৪ দিন পরপর হচ্ছে। এতে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে খালাস পয়েন্টে ট্রাক সংকটও পণ্য পরিবহন প্রক্রিয়াকে ধীর করছে। এই সংকটের ধাক্কা এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও লাগছে। কয়লা পরিবহনে বিলম্ব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
একজন লজিস্টিক কর্মকর্তা জানান, যেখানে ৮ থেকে ১০টি লাইটার জাহাজ প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩ থেকে ৪টি। এতে কয়লা পরিবহন মারাত্মকভাবে ধীর হয়ে গেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শনে গিয়ে জানান, দেশে বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ জ্বালানি মজুত রয়েছে। তার ভাষায়, এপ্রিল ও মে মাসের চাহিদা পূরণের মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি রয়েছে এবং জুন মাসেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আগেই বলেছেন, সংকটের মূল কারণ জ্বালানির ঘাটতি নয়, বরং লজিস্টিক ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বলছে, তারা গত বছরের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করছে। তবে শিল্প খাতের দাবি, চলতি বছর আমদানি অনেক বেড়েছে, ফলে চাহিদাও বেড়েছে এবং সেই অনুপাতে সরবরাহ বাড়েনি।
শিপিং অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর শফিউল বারী জানান, বহির্নোঙর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত একটি ট্রিপে লাইটার জাহাজের ৩ থেকে ৪ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ১,৫০০ থেকে ২,০০০ লিটার, যা পর্যাপ্ত নয়। ফলে জাহাজগুলো পুরো ট্রিপ শেষ করতে পারছে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিষয়টি সমাধানে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)-এর মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, জ্বালানি ছাড়া জাহাজ সময়মতো চলতে পারে না, যার প্রভাব পড়ছে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো লজিস্টিকস ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং বিদেশি জাহাজ বাংলাদেশে আসতে নিরুৎসাহিত হতে পারে।
সবশেষে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এই সংকট শুধু বন্দরের কার্যক্রমই নয়, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাজারমূল্যের স্থিতিশীলতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করবে।

