বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য-ইরান সংঘাতজনিত জ্বালানি সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। রপ্তানিকারক ও ক্রেতা সূত্র বলছে, আগামী মৌসুমে পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো আগের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ক্রয়াদেশ কমাতে পারে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থায় জ্বালানি ও পরিবহন সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্ববাজারে বিক্রির গতি ধীর হয়ে যাওয়ায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় ক্রেতারা তাদের গুদামে অবিক্রীত পণ্য জমে থাকার কারণে নতুন অর্ডার সীমিত করছেন। এতে রপ্তানি নির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খাতটি অনিশ্চয়তায় পড়েছে, যেখানে মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক থেকে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি শিপিং খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে ডিজেল সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। অনেক কারখানায় জেনারেটর চালু রাখতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজন হলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিবহন খরচেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে পণ্য পরিবহনের ভাড়া প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি সুতা, তুলা ও পলিয়েস্টারের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি একসঙ্গে “পারফেক্ট স্টর্ম” তৈরি করছে—যেখানে বৈশ্বিক চাহিদা কমা, জ্বালানি সংকট এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি একযোগে চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে ভবিষ্যৎ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইউরোপীয় ক্রেতাদের একজন প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে অনেক খুচরা বিক্রেতা এখনো পুরোনো শীতকালীন পণ্য বিক্রি করতে পারছে না। ফলে নতুন মৌসুমের জন্য অর্ডার কমানো ছাড়া তাদের হাতে বিকল্প কম। তবে কিছু ক্ষেত্রে শীতপ্রধান অঞ্চলে পোশাকের চাহিদা কিছুটা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কারখানা পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। অনেক প্রস্তুতকারক জানিয়েছেন, ডিজেল সংকটের কারণে নিয়মিত উৎপাদন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে দিনে কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে, যা সময়মতো অর্ডার সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি করছে।
শিল্প মালিকদের মতে, সময়মতো রপ্তানি নিশ্চিত করতে কিছু প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে বিমান পরিবহনের দিকে ঝুঁকছে, যা ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে লাভের মার্জিন কমে যাচ্ছে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অন্য দেশগুলো তুলনামূলক স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ ও ভৌগোলিক সুবিধার কারণে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারিত্বে চাপ তৈরি হতে পারে।
শিল্প সংগঠনগুলোর মতে, বর্তমান সংকট সাময়িকভাবে উৎপাদন ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই ধীরগতি তৈরি করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। সব মিলিয়ে তৈরি পোশাক খাত এখন একাধিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে—যেখানে বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি একসঙ্গে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

