বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত টেকসই ও পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের পথে আরও একধাপ এগিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘লিড’ বা লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন সনদ অর্জন করেছে দেশের আরও তিনটি পোশাক ও সংশ্লিষ্ট শিল্পকারখানা। এই অর্জনের ফলে দেশে লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৭-এ, যা বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন যুক্ত হওয়া তিনটি কারখানাই প্লাটিনাম ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতি পেয়েছে। এর মধ্যে দুটি গাজীপুরে এবং একটি সাভারে অবস্থিত। পরিবেশবান্ধব নকশা, জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমবান্ধব কর্মপরিবেশের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ মানের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্জন শুধু সংখ্যাগত অগ্রগতি নয়, বরং বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। একসময় স্বল্পমূল্যের উৎপাদনের দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন ধীরে ধীরে বিশ্ববাজারে টেকসই উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।
নতুন সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি গাজীপুরের অ্যাপটেক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে অবস্থিত একটি বৃহৎ গুদাম ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, যা অত্যাধুনিক জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৯০ পয়েন্ট অর্জন করে প্লাটিনাম স্বীকৃতি পেয়েছে। আরেকটি প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন গ্রুপের একটি লেবেল ও অ্যাকসেসরিজ কারখানা, যা পুরোনো অবকাঠামোকে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থায় রূপান্তর করে ৮৫ পয়েন্ট অর্জন করেছে।
তৃতীয় স্বীকৃতিটি পেয়েছে সাভারের একটি যৌথ শিল্প কমপ্লেক্স, যেখানে একাধিক পোশাক ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করে। আধুনিক নির্মাণশৈলী, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার এবং উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে এই কমপ্লেক্সও প্লাটিনাম রেটিং অর্জন করেছে।
লিড সনদ সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল প্রদান করে। একটি কারখানা কতটা শক্তি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ এবং টেকসই—এসব মানদণ্ডের ভিত্তিতেই এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ক্রেতারা এখন উৎপাদনের পরিবেশগত দিককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে গ্রিন কারখানার সংখ্যা বাড়া রপ্তানি খাতের জন্য বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব কারখানাগুলো বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে। পাশাপাশি উন্নত কর্মপরিবেশ শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে। এতে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা বাড়ে এবং রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাক খাত নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল, গত এক দশকে গ্রিন কারখানার বিস্তার সেই ভাবমূর্তি বদলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে শুধু উৎপাদনেই নয়, টেকসই শিল্পায়নেও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন নীতি ও পরিবেশগত মানদণ্ড আরও কঠোর হবে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের গ্রিন কারখানাগুলো রপ্তানি বাজার ধরে রাখা এবং সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তারা মনে করেন, টেকসই উৎপাদনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব পোশাক শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে আরও দৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

