বাংলাদেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশে দীর্ঘদিনের একটি বড় অভিযোগ ছিল ন্যূনতম কর বা টার্নওভারভিত্তিক কর ব্যবস্থা। লাভ হোক বা লোকসান—ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু বিক্রি বা মোট প্রাপ্তির ওপর কর দিতে হওয়ায় অনেক কোম্পানির ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছিল। এবার সেই পরিস্থিতি থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত মিলছে।
সরকার এখন এমন একটি ব্যবস্থা চালুর কথা ভাবছে, যেখানে কোনো কোম্পানি অতিরিক্ত ন্যূনতম কর পরিশোধ করলে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেটি ভবিষ্যতের করের সঙ্গে সমন্বয় করতে না পারলে, সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী জাতীয় বাজেটেই এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে তাদের বাড়তি পরিশোধিত ন্যূনতম কর ভবিষ্যতের করযোগ্য আয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে না পারে, তাহলে তারা সেই অর্থ ফেরতের দাবি করতে পারবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় ও সরাসরি যোগাযোগহীন পদ্ধতিতে পরিচালনার চিন্তা করছে এনবিআর। অর্থাৎ করদাতাকে আলাদা করে অফিসে ঘুরতে হবে না; অনুমোদনের পর টাকা সরাসরি ব্যাংক হিসাবে জমা হতে পারে।
কর প্রশাসনের ভেতরেও এখন স্বীকার করা হচ্ছে যে বর্তমান ন্যূনতম কর ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও কর ন্যায্যতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ, ব্যবসা লাভে থাকুক বা ক্ষতিতে—টার্নওভারের ওপর কর আদায় অনেক সময় প্রকৃত করের বোঝা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো কোম্পানি যদি প্রকৃত লাভের ভিত্তিতে ৭০ লাখ টাকা কর দেওয়ার কথা থাকে, কিন্তু টার্নওভারের কারণে তাকে ১ কোটি টাকা ন্যূনতম কর দিতে হয়, তাহলে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টাকা আর ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকে না। এতে কার্যত কোম্পানির ওপর প্রকৃত করের চাপ বেড়ে যায়।
বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান টানা লোকসান বা কম মুনাফার মধ্যে রয়েছে, তাদের জন্য এই ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। মোবাইল অপারেটর রবির তথ্য অনুযায়ী, তারা কয়েক বছরে প্রকৃত কর দায়ের চেয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বেশি ন্যূনতম কর পরিশোধ করেছে। অন্যদিকে বাংলালিংক এখনও লোকসানে থেকেও নিয়ম অনুযায়ী ন্যূনতম কর দিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের নগদ প্রবাহ ও বিনিয়োগ সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এই কর ব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছে। তাদের যুক্তি, কর আরোপের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত আয় বা মুনাফা, শুধু টার্নওভার নয়। কারণ বিক্রির অঙ্ক বড় হলেই যে কোনো প্রতিষ্ঠান লাভ করছে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এনবিআরের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে নিয়মিত কর রিটার্ন জমা দেয় মাত্র ৩০ হাজার প্রতিষ্ঠান। ন্যূনতম করের হার বিভিন্ন খাতে ১ শতাংশ থেকে ৩.৫ শতাংশ পর্যন্ত। আবার কিছু ক্ষেত্রে উৎসে কাটা করও ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য হয়, যা পরে সমন্বয় বা ফেরত পাওয়ার সুযোগ সীমিত করে দেয়।
২০১২-১৩ অর্থবছরে কর ফাঁকি ঠেকাতে এই ন্যূনতম কর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। সে সময় বহু কোম্পানি বছরের পর বছর লোকসান দেখিয়ে কর এড়িয়ে যেত বলে অভিযোগ ছিল। কর প্রশাসনের সক্ষমতা সীমিত থাকায় তখন টার্নওভারভিত্তিক করকে সহজ সমাধান হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়, এতে নিয়ম মেনে কর দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বেশি চাপ বহন করতে হচ্ছে।
এখন সরকার সেই ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছে। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, রিফান্ড ব্যবস্থা চালু হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কিছুটা কমবে। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে যাবে।
তবে এনবিআরও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, রিফান্ড চালুর আগে কর পরিপালন ব্যবস্থা ও তথ্য সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা হবে, যাতে কেউ অপব্যবহার করতে না পারে। অর্থাৎ যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কর দেয় না বা তথ্য গোপন করে, তারা যেন এই সুবিধা নিতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংস্কার বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ এটি শুধু ব্যবসায়ীদের আর্থিক চাপ কমাবে না, একই সঙ্গে কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করার দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।

