আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে গিয়ে নতুন অর্থায়ন চুক্তির পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং আইএমএফের কঠোর সংস্কার শর্তের মধ্যে বাড়তে থাকা মতপার্থক্যের কারণে বিদ্যমান কর্মসূচি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এখন নতুন করে তিন থেকে চার বছর মেয়াদি আরেকটি বড় ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে সরকার, যার আওতায় বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ পেতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল এবং আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদের মধ্যে ভার্চুয়াল বৈঠকে নতুন কর্মসূচির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, বর্তমান কর্মসূচির শর্ত ও কাঠামো নিয়ে তারা আর এগোতে চায় না।
সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্য, নতুন কর্মসূচির অধীনে ঋণের পরিমাণ, মেয়াদ ও সংস্কার পরিকল্পনা নতুন করে নির্ধারণ করা হবে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব খুব শিগগিরই আইএমএফকে পাঠাবে বাংলাদেশ। জুলাই বা আগস্টে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে এসে বিস্তারিত আলোচনা করবে বলেও জানা গেছে।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালে আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছিল। পরে এর পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। তবে দুই পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক মতবিরোধের কারণে কর্মসূচির বাস্তবায়ন ধীর হয়ে পড়ে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পেলেও বাকি অর্থ ছাড় অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে।
মূল সংকট তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক সংস্কারের শর্ত নিয়ে। আইএমএফ চেয়েছিল ব্যাংক খাত, করব্যবস্থা, ভর্তুকি নীতি ও বিনিময় হার ব্যবস্থায় দ্রুত ও কঠোর পরিবর্তন আনা হোক। কিন্তু সরকার মনে করছে, এসব শর্তের কিছু বাস্তবায়ন করলে জনজীবনে বড় চাপ তৈরি হতে পারে এবং রাজনৈতিকভাবেও তা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
সরকারের আপত্তির বড় জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে অভিন্ন ভ্যাট হার চালু, কর অব্যাহতি কমানো, বাজারভিত্তিক ডলার বিনিময় হার, বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি হ্রাস এবং ব্যাংক খাত পুনর্গঠন। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পুনর্গঠন ও ব্যাংক রেজল্যুশন আইন নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান অনেক দূরে সরে যায়।
আইএমএফের অন্যতম শর্ত ছিল দুর্বল ব্যাংকগুলোর মালিকানা কাঠামোতে কঠোর পরিবর্তন আনা। কিন্তু সরকার সাম্প্রতিক সময়ে কিছু আইনি সংশোধন করায় আন্তর্জাতিক সংস্থাটি এটিকে আর্থিক খাত সংস্কারে পিছিয়ে যাওয়া হিসেবে দেখছে বলে জানিয়েছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার এখন এক ধরনের ভারসাম্য খুঁজছে। একদিকে আইএমএফের সহায়তা প্রয়োজন, অন্যদিকে কঠোর সংস্কার বাস্তবায়ন করলে মূল্যস্ফীতি ও জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। ফলে সরকার নতুন কর্মসূচিতে তুলনামূলক নমনীয় শর্ত চায়।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আইএমএফের সঙ্গে সক্রিয় সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আইএমএফের কর্মসূচি শুধু ঋণ নয়, আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে আস্থার প্রতীক হিসেবেও কাজ করে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা কিংবা এআইআইবির মতো উন্নয়ন অংশীদাররা সাধারণত আইএমএফের ইতিবাচক মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেয়।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে বড় বাজেট বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা প্রয়োজন হবে। সেই কারণে আইএমএফের কাছ থেকে একটি ইতিবাচক বার্তা বা ‘কমফোর্ট লেটার’ পাওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। এটি পেলে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও সহজে ঋণ ও সহায়তা পাওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি খাতের চাপ সামাল দিতেও সরকার আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে দেশের ডলার বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, নতুন কর্মসূচিতে বেশি ঋণ পাওয়া গেলেও তা কার্যকর হতে সময় লাগবে। পাশাপাশি নতুন করে আরও কঠোর শর্ত যুক্ত হলে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেনের মতে, আইএমএফের অনেক সংস্কার শর্তই দেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে প্রয়োজনীয় ছিল। তাঁর মতে, চলমান কর্মসূচির সংস্কারগুলো সম্পন্ন করা গেলে দ্রুত অর্থ ছাড় পাওয়া সম্ভব হতো এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বর্তমান চাপ সামাল দেওয়া সহজ হতে পারত।
তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের ঋণ এলেও যদি সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতা থাকে, তাহলে অর্থ ছাড় আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। তখন সরকার একই সঙ্গে অর্থসংকট ও সংস্কারচাপ—দুই দিক থেকেই সমস্যায় পড়বে।

