চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশি পণ্যের রফতানি বিশ্ববাজারে ২৪.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। আগের অর্থবছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে এটি ছিল ইতিবাচক দিকের প্রবৃদ্ধি। কিন্তু এরপরের পাঁচ মাস ধরে রফতানি ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে পড়েছে। সর্বশেষ, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দুই অংকে পৌঁছে ১৪.২৫ শতাংশ।
টানা পাঁচ মাস নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকার পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের তুলনায় রফতানি কমেছে ২.১৯ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচিত সরকার আসলে বিদেশি বায়ারদের আস্থা বাড়বে। এর ফলে দেশে বিনিয়োগ ও রফতানি পরিস্থিতি ইতিবাচক দিকে ফিরতে পারে।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি, বিনিয়োগে শিথিলতা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে অর্থনীতি শ্লথ হয়ে গেছে। তবে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও রিজার্ভে এখনো কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা যায়। তবে টানা পাঁচ মাস নেতিবাচক রফতানি অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের জন্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের প্রথম ছয় মাসে রফতানি হয়েছে ২,৩৯৯ কোটি ডলার বা ২৩.৯৯ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি ছিল ২,৪৫৩ কোটি ডলার বা ২৪.৫৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২.১৯ শতাংশ। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে রফতানি হয়েছিল ৪৬২ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কমে হয়েছে ৩৮৯ কোটি ১৫ লাখ ডলার। এ হিসেবে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪.২৫ শতাংশ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইপিবি কর্মকর্তা বলছেন, সারা বিশ্বে বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব বিরাজ করছে। রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ এবং মার্কিন ও ইউরোপীয় বাজারে ট্যারিফের কারণে বাংলাদেশের রফতানি খাতে চাপ পড়েছে। দেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক খাত। গত ডিসেম্বর মাসে এ খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪.২৩ শতাংশ।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ট্যারিফের প্রভাব নিয়ে আমরা গবেষণা করছি। চীন ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশ বেশি ট্যারিফে আগ্রাসী পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে তারা কম দামে ইউরোপে পণ্য রফতানি করছে। এ কারণে আমাদের বাজারে কিছু অংশ হারিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে আমাদের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর থেকে তথ্য নিচ্ছি। অনলাইনে নির্দেশনা দিয়ে ব্যবসা খাতে উৎসাহ ফিরাতে চেষ্টা করছি। আশা করছি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার আসলে বেসরকারি বিনিয়োগ শুরু হবে এবং বিদেশী বায়ারের আস্থা ফিরবে। তখন রফতানি ও ক্রয়াদেশ বাড়বে।’
ইপিবি তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে মোট রফতানির ৮০ শতাংশ তৈরি পোশাক খাতের। এ খাতে প্রথম ছয় মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২.৬৩ শতাংশ। তবে ডিসেম্বরে নভেম্বরের তুলনায় ২.৯৭ শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বরে তৈরি পোশাক রফতানি ছিল ১৯.৮৯ বিলিয়ন ডলার, যা চলতি অর্থবছরে কমে ১৯.৩৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। নিটওয়্যারে রফতানি কমেছে ৩.২২ শতাংশ, ওভেন গার্মেন্টসে কমেছে ১.৯১ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে অন্যান্য খাতের রফতানিও কমেছে। কৃষিপণ্য ১০.৩০, ম্যানুফ্যাকচার্ড পণ্য ২.০৫, কাঠজাত পণ্য ৩৩.৩৩, হস্তশিল্প ১৫.৩৪, তুলা ও তুলাজাতীয় পণ্য ১৬.০৩ এবং প্লাস্টিক পণ্য ৮.৮৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ৫.৬১, পাট ও পাটজাত পণ্য ০.৩১ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য ২৬.১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক বিশ্ববাজারকে অস্থিতিশীল করেছে। চীন ও ভারতের মতো দেশ ইউরোপে কম দামে পোশাক পাঠাচ্ছে। ফলে আমরা একই ধরনের অর্ডার নিতে পারছি না। এ কারণে ইউরোপীয় বাজারেও রফতানি কমছে।’
হাতেম আরও বলেন, ‘ভারত সরকার মার্কিন শুল্কজনিত ধাক্কা মোকাবেলায় ব্যবসায়ীদের প্যাকেজ সহায়তা দিচ্ছে। আমাদের সরকার আইএমএফ কর্মসূচি ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের যুক্তি দেখিয়ে নগদ সহায়তা ও সুবিধা কমিয়ে দিয়েছে। যে সামান্য সহায়তা ছিল, তার মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। আমরা সরকারের কাছে সুবিধা নবায়নের অনুরোধ করেছি।’
সংগঠনটি জানিয়েছে, স্পিনিং মিল ও গার্মেন্টস একটার পর একটা বন্ধ হচ্ছে। নির্বাচনের পর নতুন সরকার শিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করলে রফতানি জুনের পর পুনরায় ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে। নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে যথাক্রমে ৭.১৪, ১৮.৮ এবং ১৪.৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৫.৩৯, অস্ট্রেলিয়ায় ২১.৩৩ এবং কানাডায় ৯.১৩ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে।
ইপিবি বলছে, বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক, চীন ও ভারতের বাড়তি মনোযোগ, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা—all এগুলো বাংলাদেশের রফতানি খাতের চ্যালেঞ্জকে জটিল করেছে।

