ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৫ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংগঠনগুলোর জাতীয় নেটওয়ার্ক ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)।
সংগঠনটির মতে, প্রস্তাবিত অধ্যাদেশকে ক্ষুদ্রঋণবান্ধব নয় বা মুনাফাভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে দেখার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা অধ্যাদেশের মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং আইনটি কার্যকর হলে দেশের ক্ষুদ্রঋণ খাত আরও শক্তিশালী ও টেকসই কাঠামোর দিকে এগোবে।
সিডিএফ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ একটি ইতিবাচক ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। এতে ক্ষুদ্রঋণ খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।
সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক একটি সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে। এ বিষয়টি অধ্যাদেশের খসড়াতেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। খসড়ার ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ব্যাংকটি সামাজিক ব্যবসার নীতিতে পরিচালিত হবে এবং বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগের অতিরিক্ত কোনো লভ্যাংশ নিতে পারবেন না। ফলে এটি কোনোভাবেই মুনাফাভিত্তিক বা ব্যক্তিমালিকানার উদ্যোগ নয়।
গণমাধ্যমে আলোচনায় আসা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ব্যাংক কাঠামোয় গেলে ক্ষুদ্রঋণের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে কি না। এ বিষয়ে সিডিএফ বলছে, প্রস্তাবিত ব্যাংকের লক্ষ্য মুনাফা অর্জন নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হবে দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কুটির শিল্পের বিকাশে সহায়তা করা। ব্যাংকটির কার্যক্রম হবে বহুমুখী। ঋণ কার্যক্রমের পাশাপাশি থাকবে ইনস্যুরেন্স সেবা, রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা, দেশি-বিদেশি অনুদান গ্রহণ এবং ঋণ সংগ্রহের সুযোগ। একই সঙ্গে কৃষি খাতে ঋণের পরিধিও বাড়ানো সম্ভব হবে।
এনজিও ও ব্যাংকের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ নিয়েও যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে সিডিএফ পরিষ্কার অবস্থান নিয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক আইন কার্যকর হলেও কোনো এনজিওকে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যাংকে রূপান্তর করা হবে না।
কোনো সংস্থা চাইলে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে তাদের কার্যক্রম ব্যাংকের আওতায় আনতে পারবে। তবে যে অংশ ব্যাংকে রূপান্তরিত হবে, তা সম্পূর্ণ আলাদা কাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে। সেই অংশের নিয়ন্ত্রণ থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে। অন্যদিকে এনজিও অংশের তদারকি করবে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)। ফলে একই কাঠামোর মধ্যে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রশ্ন নেই।
সম্পদ বা এসেট স্থানান্তর নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে বলে মনে করছে সিডিএফ। তাদের মতে, কোনো এনজিওর কেবল যে অংশ ব্যাংকে রূপান্তর হবে, সেই অংশের দায় ও সম্পদই স্থানান্তরিত হবে। সব সম্পদ বা দায় একসঙ্গে ব্যাংকে চলে যাবে—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।
প্রস্তাবিত ব্যাংকের মালিকানা কাঠামোকেও ইতিবাচকভাবে দেখছে সিডিএফ। সংগঠনটির দাবি, ব্যাংকের মোট শেয়ারের ৬০ শতাংশ থাকবে দরিদ্র সদস্যদের হাতে। ফলে অধিকাংশ শেয়ারহোল্ডার হবেন ক্ষুদ্রঋণের মূল লক্ষ্যগোষ্ঠীর মানুষ। এতে তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে এবং ব্যাংকের সম্ভাব্য উদ্বৃত্তের সুফল সরাসরি তারা পাবেন।
গ্রামীণ ব্যাংকের উদাহরণ টেনে সিডিএফ জানিয়েছে, বাংলাদেশে সেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ শেয়ার দরিদ্র সদস্যদের হাতে রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হবে বলে তারা মনে করে।
সিডিএফ আরও বলেছে, প্রস্তাবিত ব্যাংকে বিনিয়োগকারীরা কেবল তাদের বিনিয়োগকৃত মূলধনের সমপরিমাণ অর্থ ফেরত পাবেন। অতিরিক্ত মুনাফা বা ডিভিডেন্ট নেওয়ার সুযোগ না থাকায় ব্যক্তি মুনাফার উদ্দেশ্যে কেউ এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না। ফলে অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ শেয়ারের বিনিয়োগ মূলত বিভিন্ন এনজিওর উদ্বৃত্ত তহবিল থেকেই আসবে। এতে ব্যাংকের যে কোনো উদ্বৃত্ত শেষ পর্যন্ত দরিদ্র সদস্যদের কল্যাণেই ব্যবহৃত হবে।
সিডিএফের দাবি, এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের আইন থাকলেও সেগুলো মূলত মুনাফাভিত্তিক কাঠামোর। সেই তুলনায় বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক একটি ব্যতিক্রমী ও উন্নত ধারণা নিয়ে আসছে, যেখানে সামাজিক উন্নয়নই হবে প্রধান লক্ষ্য। এই উদ্যোগ সফল হলে তা দেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতের পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিসরেও একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

