যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ নামে এলপিজি পরিবাহী ট্যাংকারটিকে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অভিযোগ, জাহাজটি ইরানি জ্বালানি পরিবহন করেছে। গত বছরের ৯ অক্টোবর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সময় জাহাজটি বাংলাদেশে অবস্থান করছিল।
তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থিং লিস্টে এখনও জাহাজটির নাম রয়েছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ এখনো বন্দরে আছে। বার্থিং লিস্ট অনুযায়ী, জাহাজটিতে ৪২ হাজার ৯২৪ টন এলপিজি ছিল। বার্থিং লিস্ট হলো বন্দরে থাকা জাহাজের তথ্য সংরক্ষণের তালিকা। এতে থাকে জাহাজের শেষ পোর্ট, পতাকা, পরিবহনকৃত পণ্য, পরিমাণ, আগমনের তারিখ ও স্থানীয় এজেন্টের নাম।
সম্প্রতি এলপিজি সংকটের প্রেক্ষিতে তথ্য যাচাই করা হলে দেখা গেছে, বন্দরের তালিকায় থাকা সত্ত্বেও জাহাজটি বাংলাদেশে নেই। চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই, কখন জাহাজটি দেশ ত্যাগ করেছে। স্থানীয় এজেন্ট সিওয়েভ মেরিন সার্ভিস জানায়, তাদের অনুমতি ছাড়াই জাহাজটি ১৫ নভেম্বরের আগে বাংলাদেশ ছাড়ে। জাহাজের বর্তমান অবস্থানও জানা নেই। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) গ্যাস সংক্রান্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক জানান, জাহাজটি নিয়ে আন্তর্জাতিক অ্যাডমিরালটি আদালতে মামলা হয়েছিল। আদালতের আদেশে জাহাজ আটক হয়। পরে মামলা নিষ্পত্তি হয় এবং কয়েকদিন আগে জাহাজ চলে যায়।
চট্টগ্রাম বন্দর, নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর ও অন্যান্য সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর ৪৪ হাজার ৯২৫ টন এলপিজি নিয়ে ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ বন্দরে আসে। জাহাজটির স্থানীয় এজেন্ট ছিল সিওয়েভ মেরিন সার্ভিস। ১৩ অক্টোবর বিএলপিজি সোফিয়া নামের আরেকটি ট্যাংকারে এলপিজি খালাসের সময় দুই জাহাজে আগুন ধরে যায়। এতে ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, বিএলপিজি সোফিয়ার ক্ষয় মারাত্মক।
ঘটনার তদন্তে বন্দরের হার্বার অ্যান্ড মেরিন বিভাগের কমোডর এম ফজলার রহমানকে আহ্বায়ক করে আট সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটির প্রতিবেদনের বিস্তারিত গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়নি। তখন থেকেই অভিযোগ ছিল, জাহাজটি ইরানি এলপিজি নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে।
এদিকে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দুটি অ্যাডমিরালটি মামলায় জাহাজ আটক হয়। কয়েক মাসের আইনি জটিলতার পর ৫ সেপ্টেম্বর জাহাজটিকে পুনরায় গ্যাস স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর ৯ অক্টোবর ওএফএসি জাহাজটিকে নিষিদ্ধ করে। তবে গ্যাস আদৌ স্থানান্তর হয়েছে কি না তা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পোর্ট ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই বন্দর ত্যাগ করেছে ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস:
ওএফএসির নিষেধাজ্ঞার এক মাস চার দিন পর, ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের পোর্ট ক্লিয়ারেন্স (পিসি) ছাড়া দেশ ত্যাগ করে। বিষয়টি নিয়ে সিওয়েভ মেরিন সার্ভিসের পক্ষ থেকে ২৩ নভেম্বর কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। জিডিটি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির এক্সিকিউটিভ অপারেশন মনোয়ার পারভেজ।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, “ক্যাপ্টেন নিকোলাস এলপিজি নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল। পরে এলপিজি স্থানান্তরের সময়ে জাহাজটিতে আগুন লাগে। এরপর আন্তর্জাতিক অ্যাডমিরালটি আদালতে মামলা হয়েছিল। আদালতের আদেশে জাহাজ আটক হয়েছিল। তবে মামলা শেষ হয়ে গেছে এবং শুনেছি কয়েকদিন আগে জাহাজ চলে গেছে।”
সিওয়েভ মেরিন সার্ভিসের জেনারেল ম্যানেজার মঈন ছিদ্দিক জানিয়েছেন, “১৬ নভেম্বর থেকে জাহাজটির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এজন্য আমরা বন্দর, কোস্টগার্ড ও নেভিসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। এরপর প্রিন্সিপালকে মেইল করেছি, কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি। তাই কুতুবদিয়া থানায় জিডি করেছি।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “বন্দর থেকে জাহাজটির পিসি নেওয়া হয়নি। পিসি ছাড়া বন্দরের বার্থিং লিস্টে নাম রয়ে যায়। প্রিন্সিপাল আমাদের পিসি নিতে বলেননি।”
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি থেকে জাহাজটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়ে সিওয়েভ মেরিন অবগত হলেও, বন্দরের বার্থিং লিস্টে নাম থাকার ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন জহিরুল ইসলাম বলেন, “২০২৪ সালে জাহাজটি এসেছিল এবং তখন ইরানি এলপিজি পরিবহনের অভিযোগ ওঠে। একটি কমিটি গঠন করে তদন্ত করা হয়। তারপর বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে যায়। এরপর থেকে জাহাজের খবর আমি রাখিনি। আমাদের কাজ শুধু বন্দরে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে পাইলটিং দেওয়া।” তিনি আরও বলেন, “বার্থিং লিস্টে নাম থাকা সত্ত্বেও জাহাজটি এখন বন্দরে নেই। জাহাজের বিস্তারিত জানার জন্য নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।”
নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ জানান, “যে কোনো জাহাজ বন্দরে প্রবেশের ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঘোষণা দিতে হয়। বন্দর ছাড়ার সময় পিসি নিতে হয়। ২০২৪ সালে ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’-এর আগুনের ঘটনায় একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। আমাদের একজন শিপ সার্ভেয়ারও ছিলেন। পরে মামলা জটিলতায় পড়ে।” তিনি জানালেন, জাহাজের নাম ও পতাকা পরিবর্তনের বিষয়ে তার কোনো তথ্য নেই। সিওয়েভ মেরিন সার্ভিসের সিইও শেখ সামিদুল ইসলাম বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। নির্বাচনি ব্যস্ততার কথা বলে ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তীতে ফোন রিসিভ করেননি।
কুতুবদিয়া থানায় জিডি ও তার ভুল তারিখ:
জিডিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর জাহাজটি কুতুবদিয়া বহির্ণোঙরে আসে এবং ৪২ হাজার ৯২৪ টন এলপিজি বহন করছিল। তবে এটি ভুল। জাহাজটি আসলে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করেছিল। মঈন ছিদ্দিক বিষয়টি ভুলবশত জিডিতে লেখা হয়েছে বলে জানান।
ওসি মো. আরমান হোসেন বলেন, “জাহাজটি নির্ধারিত স্থানে না থাকায় স্থানীয় এজেন্ট কুতুবদিয়া থানায় লিখিতভাবে জানিয়েছিল। পুলিশের একটি টিম স্পিডবোটে পরিদর্শন করেও জাহাজের হদিস পাওয়া যায়নি। পরে জিডি হিসেবে এন্ট্রি করা হয়।
নাম ও পতাকার পরিবর্তন:
চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থানকালে জাহাজটির নাম ও পতাকা পরিবর্তনের বিষয়ও ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ওএফএসির নিষেধাজ্ঞায় জাহাজটির নাম ‘আদা’ এবং পূর্বনাম ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশে আসার সময় এটি তানজানিয়ার পতাকা বহন করে ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ নামে বন্দরে প্রবেশ করেছিল।
মেরিন ট্রাফিক ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বর্তমানে জাহাজটির নাম ‘আদা’ এবং বতসোয়ানার পতাকা বহন করছে। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, এটি মালাক্কা প্রণালির মধ্য দিয়ে চীনের দিকে যাচ্ছে। মেরিটাইমঅপটিমা জানাচ্ছে, ১৮ ডিসেম্বর জাহাজটি আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে পৌঁছে এবং ২৫ ডিসেম্বর চীনের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ে।
অন্য ট্র্যাকিং সাইট ভ্যাসেল ট্র্যাকার অনুযায়ী, জাহাজটির নাম ‘কালাস্তিন’ এবং বতসোয়ানার পতাকা বহন করছে। মঈন ছিদ্দিক বলেন, “জাহাজটি ওমানের সোহার বন্দর থেকে আসে এবং ১২ নভেম্বর পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তখন পর্যন্ত নাম ও পতাকা পরিবর্তনের তথ্য আমাদের জানানো হয়নি। একেক সাইটে একেক নাম ও পতাকা দেখা যাচ্ছে।”
জাহাজটি ১৯৯২ সালে নির্মিত। ২০২২ সাল পর্যন্ত নাম ছিল ‘সানি গ্রিন’। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে নাম পরিবর্তন হয়ে ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ হয়। ২০২৫ সালের আগস্টে জাহাজটির নাম পরিবর্তন করে ‘আদা’ রাখা হয়।
জাহাজটি ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশে আসার সময় পরিবহনকৃত এলপিজি ইরানি বলে অভিযোগ উঠেছিল। তবে বন্দরের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। মো. ওমর ফারুক বলেন, “জাহাজ আসার পর অভিযোগ ওঠায় আমরা ডকুমেন্ট পর্যালোচনা করি। কোনো প্রমাণ পাইনি।”
স্থানীয় এজেন্ট সিওয়েভ মেরিনের জেনারেল ম্যানেজার মঈন ছিদ্দিক বলেন, “এখন যুক্তরাষ্ট্র বলছে এগুলো ইরানি গ্যাস। আমরা বলতে পারি না আসলে কী হয়েছে। আমাদের কাছে প্রাপ্ত ডকুমেন্ট অনুযায়ী, জাহাজের লোডিং পোর্ট ছিল সোহার, ওমান।”

