ঋণপত্র বা এলসি ছাড়াই বিক্রয় চুক্তির (সেলস কন্ট্রাক্ট) ভিত্তিতে পণ্য আমদানি করা অবারিত হতে পারে। বর্তমানে এলসি ছাড়া সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ ডলার পর্যন্ত বাণিজ্যিক আমদানি করা যায়। তবে নতুন আমদানি নীতি (২০২৫-২৮) খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে, যে কোনো অনুমোদিত পণ্য এলসি ছাড়াই যে কোনো পরিমাণ আমদানি করা যাবে। এ ছাড়া, নতুন নীতিতে পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান নীতিতে এটি নিষিদ্ধ।
সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানি হলে বিদেশি বিক্রেতার সঙ্গে সব ধরনের চুক্তি হয়। অর্থপ্রেরণাসহ সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। গতকাল রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবালয়ে ২০২৫-২৮ মেয়াদের নতুন আমদানি নীতি খসড়া নিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে খসড়ায় আরও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নতুন নীতি যুগোপযোগী করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয়ে একটি কমিটি প্রস্তাব দিয়েছে।
বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, আমদানি নীতি পরিবর্তনের বিষয়ে এক মাস ধরে আলোচনা চলছে। উদারীকরণ ও সহজীকরণের লক্ষ্যেই এসব প্রস্তাব আনা হয়েছে। আমদানির পদ্ধতি, পণ্যের মান যাচাই ও অন্যান্য শর্ত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রস্তাব উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন পেলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে। সম্ভব হলে আগামী বৈঠকেই বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, নতুন আমদানি নীতিতে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নানা পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যাগ্রিমেন্টে স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ব্যবসা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, খসড়া প্রস্তুতের আগে বিভিন্ন চেম্বার, ব্যবসায়ী সংগঠন ও অ্যাসোসিয়েশনের মতামত নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে খসড়ার মূল প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করা হয়। নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশের এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণকেও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণে প্রায় ১০ মাস বাকি থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতি সাজানো হচ্ছে। উল্লেখ্য, বিদ্যমান আমদানি নীতি (২০২১-২৪) ২০২৪ সালের জুনে মেয়াদ শেষ হলেও নতুন আদেশ জারি না হওয়ায় পুরোনো নীতিই কার্যকর রয়েছে।
নতুন খসড়ায় পরিবেশ ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে হাইড্রোলিক হর্নের শব্দ সর্বোচ্চ ১০০ ডেসিমেল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। প্রথমবারের মতো পেট্রো কেমিক্যাল শিল্পের কাঁচামাল ইথাইলিন ও প্রোপাইলিন আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে, তবে বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের অনুমতি নিতে হবে। মিথাইল ব্রোমাইডের কারণে অস্ট্রেলিয়ায় চাল ও মসলার রপ্তানি সমস্যার সমাধানও খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার আমদানিতে আলাদা এইচএস কোড নির্ধারণ, পরিবেশবান্ধবভাবে ব্যাটারি রিসাইক্লিং নিশ্চিত করে পুরোনো ব্যাটারি আমদানির সুযোগ এবং পাম অলিন আমদানি নিশ্চিত করার জন্য বিএসটিআই সনদের বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খসড়ায় সব ধরনের বর্জ্য পদার্থ আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে চিংড়ি, জীবিত শূকর ও শূকরজাত পণ্য, পোস্তদানা, পপি বীজ, ঘাস, ঘন চিনি, কৃত্রিম সরষের তেল, রিকন্ডিশন্ড অফিস ইকুইপমেন্ট, পুরোনো কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী। এছাড়া ৭৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দের হর্ন, ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক, পলিথিন ও পলিপ্রোপাইলিন ব্যাগ, দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনের থ্রি-হুইলার গাড়িও নিষিদ্ধ।
শর্তসাপেক্ষে আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি, তিন বছরের বেশি পুরোনো ও ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল, সাড়ে ৪ সেন্টিমিটারের কম ব্যাসের কারেন্ট জাল এবং এলএনজি। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকরা মনে করেন, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানে গাড়ির বয়সসীমা শিথিল থাকায় সাধারণ মানুষ কম খরচে গাড়ি ব্যবহার করতে পারে।

