আজ মঙ্গলবার ঢাকায় ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ ও নেপালের অষ্টম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠক। দুই দিনব্যাপী এই বৈঠক শেষ হবে আগামীকাল বুধবার। বৈঠকে বিদ্যুৎ আমদানি বৃদ্ধিসহ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ট্রানজিট সুবিধা, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি (পিটিএ) চূড়ান্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হবে। বিষয়গুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশের পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। নেপালের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন দেশটির শিল্প, বাণিজ্য ও সরবরাহ মন্ত্রণালয়ের সচিব রাম প্রসাদ ঘিমি। বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হচ্ছে বিদ্যুৎবাণিজ্য জোরদার করা। বিশেষ করে নেপালের জলবিদ্যুৎ খাত ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ বাড়ানো।
বর্তমানে নেপাল থেকে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। গত বছরের ৩ অক্টোবর বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে এই সরবরাহ শুরু হয়। বৈঠকে নেপাল থেকে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির প্রস্তাব তুলবে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, বৈঠক বিদ্যুৎবাণিজ্যসহ দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন গতি আনবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী নভেম্বরে বাংলাদেশ ও নেপাল–উভয় দেশই এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। এর ফলে শুল্কমুক্ত বাজারের সুবিধা কমবে এবং নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। তাই আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানো জরুরি। তিনি আরও বলেন, নেপাল থেকে কম দামে বিদ্যুৎ আমদানি সম্ভব। একই সঙ্গে নেপালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সুযোগ বাড়ছে। প্রতি বছর নেপালি শিক্ষার্থীরাও বাংলাদেশে আসে। প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকলে এই খাত আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
ট্রানজিট সুবিধা:
বৈঠকে ট্রানজিট সুবিধা প্রসারও আলোচিত হবে। নেপাল বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে পণ্য পরিবহন বাড়াতে চায়। এতে ট্রানজিট রুট, কার্যকর কাঠামো এবং নৌপথ ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগ জোরদারে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে বিবিআইএন চুক্তি রয়েছে। ২০১৫ সালের ১৫ জুন চার দেশ এই চুক্তিতে সই করে। তবে ভুটানের সংসদ অনুমোদন না দেওয়ায় চুক্তিটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বাংলাদেশ নেপালকে ২০২২ সালের ৩০ মে মন্ত্রিসভার অনুমোদনে ট্রানজিট সুবিধা দেয়। নেপাল বৈচিত্র্য আনতে বিবিআইএনের পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ট্রানজিট চায়।
বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে ১৯৭৬ সালের চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ থেকে নেপালে পণ্য রপ্তানি হয় এবং তৃতীয় দেশ থেকে আমদানি পণ্য ভারত ব্যবহার করে ‘ট্রাফিক ইন ট্রানজিট’ হিসেবে পরিবহন করা হয়। মূলত দুটি রেলরুট ব্যবহার হচ্ছে–রোহনপুর-সিঙ্গাবাদ এবং বিরল-রাধিকাপুর। নেপাল এখন নৌপথে ট্রানজিট সুবিধাও পেতে চায়। এছাড়া বাংলাদেশ-নেপাল-ভারত ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ও আলোচনায় থাকবে।
পিটিএ চুক্তি: দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি (পিটিএ) বাস্তবায়ন হলে নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্ক ছাড় বা কম শুল্ক সুবিধা মিলবে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, এবারের বৈঠকে পিটিএ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পথে অগ্রগতি হবে।
এসপিএস ও টিবিটি সহযোগিতা:
খাদ্য নিরাপত্তা ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য ও মানসংক্রান্ত সহযোগিতা গুরুত্ব পাচ্ছে। স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা (এসপিএস) এবং বাণিজ্যে কারিগরি বাধা (টিবিটি) সংক্রান্ত বিষয় আলোচিত হবে। এ ছাড়া বিএসটিআই ও নেপালের খাদ্য প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়ন, নেপাল ব্যুরো অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড মেট্রোলজির সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয় জোরদারের বিষয়ও আলোচনায় থাকবে।
ভিসা, বাণিজ্য ও সংযোগ:
ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত সহজ করতে ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানো, বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, পেমেন্ট ব্যবস্থা সহজীকরণ এবং সরকার-টু-সরকার ও বিজনেস-টু-বিজনেস বাণিজ্য কার্যক্রম জোরদারের বিষয় আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। এছাড়া বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরসহ সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়ন, আইসিপি ও আইসিডি শক্তিশালীকরণ, রেলসংযোগ সম্প্রসারণ এবং শুল্ক প্রক্রিয়া সহজীকরণও গুরুত্ব পাবে।
পর্যটন ও এলডিসি উত্তরণ:
নেপাল সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর প্রস্তাব তুলেছে কক্সবাজার ও পোখরার মধ্যে। এছাড়া এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং টেকসই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায় থাকবে।

