চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদারভেসেল বা বড় জাহাজ আটকে রয়েছে। এতে পণ্য খালাসে দেরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমস্যার মূল কারণ লাইটারেজ বা ছোট খালাসি জাহাজের ঘাটতি। সহস্রাধিক লাইটারেজ পানিতে ভাসমান থাকায় আমদানিপণ্য দ্রুত নামানো সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে রয়েছে রোজায় ব্যবহৃত জরুরি পণ্যও।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় এই পরিস্থিতি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অভিযোগ উঠেছে, অনেক আমদানিকারকের নিজের খালাস বা স্টোরেজ সুবিধা নেই। তাই তারা লাইটারেজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। এরপরই ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
ফলে লাইটারেজ খালাস করতে সময় বেশি লাগছে। এর সঙ্গে নৌপথে পণ্য পরিবহনে সংকটও সৃষ্টি হচ্ছে। একদিকে মাদারভেসেলের ডেমারেজের কারণে লাখ লাখ ডলার বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ-বিদেশে।
লাইটারেজ জাহাজের সংখ্যা এবং দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ কারা?
চট্টগ্রাম বন্দরে বাল্কপণ্যবাহী মাদারভেসেল থেকে পণ্য খালাসের জন্য দুই হাজারের মতো লাইটারজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে এক হাজারের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (ডব্লিউটিসিসি)। সংস্থাটি প্রতিদিন বার্থিং সভা করে মাদারভেসেলের চাহিদা অনুযায়ী লাইটারেজ বরাদ্দ দেয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাদারভেসেল থেকে পণ্য খালাসে লাইটারেজ বরাদ্দ দিতে ডব্লিউটিসিসিকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাকী লাইটারজাহাজগুলো বিভিন্ন বড় শিল্পগ্রুপের মালিকানাধীন। এর মধ্যে রয়েছে মেঘনা, সিটি, আবুল খায়ের, আকিজ, টিকে, বসুন্ধরা গ্রুপের লাইটারজাহাজ।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে ১৪৬টি মাদারভেসেল অবস্থান করছিলো। গত বছর ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৯৯টি। ২৬ জানুয়ারি বন্দরে ১৩৪টি কনটেইনার ও বাল্কপণ্যবাহী জাহাজ ছিল। এর মধ্যে ১২টি কনটেইনারবাহী, ১০টি এলএনজি, এলপিজি ও পেট্রোলিয়াম ট্যাংকার। বাকি ১১২টি বাল্কজাহাজে ছিল চাল, গম, ডাল, সরিষা, ‘র’ সুগার, সয়াসিড, সার, লোহার স্ক্র্যাপ, সিমেন্ট ক্লিংকার, কয়লা, পাথর ও প্লাস্টিক দানা। এর মধ্যে ৫৯টি জাহাজ বহির্নোঙরে খালাসে ব্যস্ত ছিল।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে মাদারভেসেলের ধরন অনুযায়ী অবস্থান:
- জেনারেল কার্গো (স্ক্র্যাপ, পাথর) – ৫৩টি
- গম-ভুট্টাবাহী – ২৫টি
- সিমেন্ট ক্লিংকার – ২০টি
- সার – ৭টি
- চিনি – ৫টি
- লবণ – ২টি
গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যশস্যের আমদানি বেশি হওয়ায় লাইটারেজ সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইভোয়াক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান।
নিবন্ধিত পণ্যবাহী লাইটার ৩৮৫৮টি:
চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটারেজ সংকটের সমস্যা নিয়ে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মুখ্য পরিদর্শক মো. শফিকুর রহমান বলেন, “নিবন্ধিত বর্তমানে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কাছে ৩,৮৫৮টি পণ্যবাহী লাইটার রয়েছে। আমদানিকারকদের দ্রুত লাইটার খালাস করার নির্দেশ দিয়েছি। ইতোমধ্যে বিআইডব্লিউটিসি, কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। অনেক লাইটার জাহাজকে জরিমানা করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “রমজান সামনে রেখে অনেকে ভোগ্যপণ্য আমদানি করেছেন। এছাড়া গম, সার ও কয়লা বহনকারী অনেক জাহাজও বন্দরে রয়েছে। আমাদের অভিযান আগামী রমজান পর্যন্ত চলবে। আশা করছি দ্রুত এই সংকটের সমাধান হবে।” ডব্লিউটিসিসি সূত্র জানায়, ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের ৭৪টি ঘাটে ৬৩০টি লাইটারেজ পণ্য খালাসের জন্য অপেক্ষা করছে। এর মধ্যে ১৩৪টি লাইটার ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে অপেক্ষমাণ।
সবচেয়ে বেশি লাইটারেজ অপেক্ষমাণ রয়েছে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, হাসনাবাদ ও যশোরের নোয়াপাড়া ঘাটে। এছাড়া ঝালকাঠি, নগরবাড়ি, মিরপুর, রূপসী, ভৈরব, সারুলিয়া, হাটাবো, পটুয়াখালী, মুক্তারপুর, আলীগঞ্জ, রামপাল, আশুগঞ্জ, কর্ণফুলী নদীর সদরঘাট, সি অ্যান্ড বি, মেঘনা, ব্রিজঘাট, শিকারপুর, স্ক্যান সিমেন্ট, এমআই সিমেন্ট, পলাশ, পাগলা, বানারীপাড়া, মোংলা, আকিজ সিমেন্ট, নিতাইগঞ্জ ও শিরমনি ঘাটেও লাইটার খালাস হচ্ছে।
৪৭ দিন ধরে পণ্য খালাসের জন্য আটকে আছে ‘আনিসা জান্নাত-১’:
চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটারেজ সংকট এখন গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাধারণত লাইটারেজ জাহাজ এক থেকে দুই সপ্তাহে পণ্য খালাস শেষ করে ফিরে আসে। কিন্তু এখন কিছু জাহাজ ৪৭ দিন পর্যন্ত খালাসের জন্য অপেক্ষা করছে।
ডব্লিউটিসিসির তথ্য অনুযায়ী, ‘এমভি আনিসা জান্নাত-১’ লাইটারেজ জাহাজটি ১০ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম থেকে টিএসপি সার নিয়ে আশুগঞ্জ ঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। আজ পর্যন্ত জাহাজটি খালাসে অবস্থান করছে—মোট ৪৭ দিন। এটি ডব্লিউটিসিসির লাইটারগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সময় ধরে অপেক্ষমাণ।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৬ দিন অপেক্ষা করছে ‘এমভি শুভরাজ-৮’, যা ১১ ডিসেম্বর গম নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জের হাসনাবাদ ঘাটে গেছে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩৭ দিন অবস্থান করছে ‘এমভি ফজলুল হক-৭’, যা ভুট্টা নিয়ে নিতাইগঞ্জ ঘাটে খালাসের জন্য অপেক্ষা করছে। এছাড়া, ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে কাঁচপুর ঘাটে পাথরবোঝাই ‘এমভি বিসমিল্লাহ নেভিগেশন-৩’ গেছে, একই দিনে কর্ণফুলী নদীর সদরঘাটে অবস্থান করছে স্ক্র্যাপবোঝাই ‘এমভি জাহিদ নাসির’ এবং ৫ জানুয়ারি থেকে আশুগঞ্জে ডালবাহী ‘এমভি মানহা’ খালাসের জন্য অপেক্ষমাণ।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, “লাইটারেজের সংকট বন্দরের অপারেশনাল কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। জাহাজের গড় অবস্থানকাল বাড়ছে, এতে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে। এছাড়া জাহাজগুলো দীর্ঘ সময় বসে থাকায় দৈনিক ডেমারেজ খরচও বাড়ছে।”
ডব্লিউটিসিসির সিনিয়র সচিব মো. নাছির উদ্দিন জানান, “আমাদের অধীনে বর্তমানে ১,০২১টি লাইটারেজ রয়েছে। এর মধ্যে ৬৩০টি লাইটারেজ দেশের বিভিন্ন ঘাটে পণ্য খালাসে অপেক্ষমাণ। এর মধ্যে ১৫ দিনের বেশি সময় অপেক্ষা করছে ১৩৪টি লাইটার। এদের মধ্যে ৪৬টিতে গম, ৪৩টিতে সার, ১২টিতে ভুট্টা, ৮টিতে সয়াসিড, ৭টিতে বিভিন্ন ধরনের ডাল রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘসময় ঘাটে অপেক্ষমাণ জাহাজগুলো মূলত গম ও সার বহনকারী। কিছু ডালবাহী জাহাজও আছে, তবে ডাল ছাড়া অন্যগুলো রমজানের জন্য জরুরি নয়। মূলত একসঙ্গে বেশি বাল্কপণ্য আমদানি হওয়ায় লাইটারেজের চাহিদা বেড়েছে। অনেক লাইটার আনলোড পয়েন্টে অপেক্ষমাণ থাকায় বহির্নোঙরে মাদারভেসেল থেকে পণ্য খালাস কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। বড় শিল্পগ্রুপের কাছেও লাইটারেজ রয়েছে। সিটি ও আবুল খায়ের গ্রুপ তাদের পণ্য পরিবহনের জন্য ডব্লিউটিসিসি থেকে লাইটারেজ নিচ্ছে, যদিও তাদের নিজস্ব লাইটারও আছে।”
বিপাকে পড়েছে মাদারভেসেলগুলো:
চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটারেজ সংকটের কারণে মাদারভেসেলগুলো নির্ধারিত সময়ে পণ্য খালাস করতে পারছে না। এর ফলে জাহাজের গড় অবস্থানকাল বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিটি জাহাজকে অবস্থানের জন্য দৈনিক ১০ থেকে ২৫ হাজার ডলার অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত পরিচালক শফিউল আলম বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে ১১৪টি মাদারভেসেল বিভিন্ন পণ্য নিয়ে অবস্থান করছে। এর মধ্যে ৯০টি খাদ্যপণ্য বহনকারী মাদারভেসেল খালাসের জন্য ডব্লিউটিসিসির অনুমোদনের অপেক্ষা করছে।”
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত লাইটারেজের সংখ্যা তিন হাজার ৮০০-এর বেশি বলা হলেও, শফিউল আলম বলেন, “এটি সঠিক নয়। বাস্তবে এত লাইটারেজ বাংলাদেশে নেই। বর্তমানে ডব্লিউটিসিসির অধীনে প্রায় ৮৩০টি লাইটারেজ আছে। এগুলো চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাসের জন্য ব্যবহার হয়। এছাড়া বিভিন্ন করপোরেট গোষ্ঠীর কাছে কিছু লাইটার রয়েছে।”
ভাসমান গুদাম থেকে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম জট:
চট্টগ্রামের কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “বড় বড় আমদানিকারকরা লাইটারেজ জাহাজকে ভাসমান গুদাম বানিয়ে রেখেছে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে জাহাজের ডেমারেজ তেমন কিছু নয়।”
তিনি আরও জানান, “ডব্লিউটিসিসি থেকে আগে আমরা মাদারভেসেল প্রতি দৈনিক ৬-৭ হাজার টন পণ্য খালাস করাতাম। এখন এক হাজার টনও খালাসের জন্য লাইটার পাওয়া যায় না। ফলে প্রতিটি মাদারভেসেলকে দৈনিক ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ দিতে হচ্ছে।”
আইভোয়াক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান বলেন, “গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে খাদ্যশস্যের আমদানি বেশি হওয়ায় লাইটারেজ সংকট তৈরি হয়েছে। কিছু আমদানিকারক মাদারভেসেল থেকে পণ্য খালাস করে লাইটারেজে রেখে দিচ্ছে। আবার স্টোরেজের অভাবে অনেকে সরাসরি লাইটারেজ থেকে পণ্য বিক্রি করছে। এতে সংকট আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, “লাইটারেজ নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অধীনে। চট্টগ্রামে আমদানি পণ্য খালাসের জন্য লাইটারেজ ব্যবস্থাপনা হয় ডব্লিউটিসিসি মাধ্যমে। এছাড়া লাইটারেজ মালিক সমিতি রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠান বন্দর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। মূলত ট্রাকের মতোই পণ্য পরিবহন করে।
লাইটারেজ সংকট বন্দরের অপারেশনাল কাজে ব্যাঘাত তৈরি করছে। জাহাজের গড় অবস্থানকাল বেড়ে যাচ্ছে এবং দৈনিক ডেমারেজের খরচ বাড়ছে। আমরা নৌপরিবহন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমাধানের জন্য আলাপ চালাচ্ছি।

