বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান টিবিএসকে নিশ্চিত করেছেন, আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। চুক্তির মূল আকর্ষণ হলো—মার্কিন তুলা ব্যবহার করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে এবং বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক হার কমানো হবে। তবে এসব সুবিধা পেতে বাংলাদেশকে একাধিক শর্ত পূরণ করতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের রেসিপ্রোকাল শুল্কহার ২০ শতাংশ, যা নতুন চুক্তির পর কমে আসতে পারে। বাণিজ্য সচিব জানান, চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুইপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন হার ঘোষণা করবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ধারণা, নতুন হার প্রায় ১৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
শুল্কহারে এই ছাড়ের বিনিময়ে বাংলাদেশ কিছু শর্ত মানতে রাজি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানো, ই-কমার্স পণ্য ও সেবায় শুল্ক আরোপ না করা, মৎস্য রপ্তানিতে ভর্তুকি প্রত্যাহার, মেধাস্বত্ব (আইপিআর) শর্ত মানা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) সংস্কারের প্রস্তাব সমর্থন করা।
বর্তমান ডব্লিউটিও বিধান অনুযায়ী, ই-কমার্সের মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্য ও সেবা শুল্কমুক্ত, যা আগামী মার্চে ডব্লিউটিওর ১৪তম মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলন শেষ হলে সমাপ্ত হবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দিয়েছে, ই-কমার্সে শুল্ক আরোপ কখনও হবে না। এর ফলে অনলাইনে কেনা পণ্য বা সেবা শুল্কমুক্ত থাকবে।
মোস্তফা আবিদ খান, সাবেক বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সদস্য, জানান, যুক্তরাষ্ট্র ই-কমার্সের ওপর স্থায়ী স্থগিতাদেশ চাইছে। এ ধরনের প্রস্তাব আগেও আফ্রিকা, ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ৭৯টি দেশ নিয়ে গঠিত OSPS গ্রুপ দিয়েছে।
ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “শুধু ই-কমার্সের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা আমদানিতে ট্যারিফ আরোপ হবে না। এতে রাজস্ব আহরণ কমবে, তবে অন্য কোনো সমস্যা নেই।”
মার্কিন তুলা দিয়ে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে বাংলাদেশকে মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “বাংলাদেশের প্যাটেন্ট আইন কিছুটা নমনীয়। যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত অনুযায়ী সেটি সংশোধন করতে হবে।”
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়িয়েছে। নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) জানিয়েছে, এই চুক্তি কার্যকর হলে উভয়পক্ষের জন্য লাভজনক হবে—যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়বে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিও বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮.৬৯ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ওভেন পোশাক ৪.৯৫ বিলিয়ন ডলার, নিটওয়্যার ২.৬০ বিলিয়ন ডলার, হোম টেক্সটাইল ১৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ক্যাপ ২৫৯ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করেছে, যা আগের বছরের ২৭৮ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় বেড়েছে। মোট তুলা আমদানের প্রায় ১০ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
গত বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৯০ দেশের ওপর অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেয়। আলোচনার পর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর। পরবর্তীতে চুক্তির মাধ্যমে এই হার আরও কমানো হবে এবং মার্কিন তুলা দিয়ে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত হবে।

