বাংলাদেশের বাণিজ্য ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হলো। প্রথমবারের মতো কোনো দেশের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি বা ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ) স্বাক্ষর করল বাংলাদেশ। এই চুক্তির ফলে জাপানের বাজারে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।
গতকাল শুক্রবার জাপানের রাজধানী টোকিওতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে সই করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পক্ষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান, জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দাউদ আলী ও বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচিসহ দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এই ইপিএ বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের জন্য জাপানের বাজার আরও সহজ ও প্রতিযোগিতামূলক হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ সুবিধা যুক্ত হওয়ায় কাঁচামালের উৎস নিয়ে জটিলতা ছাড়াই বাংলাদেশি পোশাক জাপানে রপ্তানি করা যাবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের বাজারেও ধাপে ধাপে জাপানি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্য শুল্ক ছাড় পাবে। পরবর্তী ছয় থেকে আট বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ৭০২টি পণ্য এই সুবিধার আওতায় আসবে। সব ধাপ সম্পন্ন হলে দুই দেশের মোট ৯ হাজার ৩৫৪টি পণ্যে শুল্ক থাকবে না। এর মধ্যে বাংলাদেশি পণ্যের সংখ্যা ৭ হাজার ৪৩৬টি।
তবে জাপানের তৈরি গাড়ি এই চুক্তির আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদনে জাপানি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়; বরং বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রতিফলন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চুক্তিটির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
ইপিএর আওতায় পণ্যের পাশাপাশি সেবা খাতেও সুযোগ বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, শিক্ষা, কেয়ারগিভিং ও নার্সিংসহ প্রায় ১৬টি খাতের ১২০টি সেবা ক্ষেত্রে বাংলাদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য জাপানে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।
বিপরীতে বাংলাদেশ ১২টি বিভাগের অধীনে ৯৮টি উপখাত জাপানের জন্য উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে, যদিও উপখাতগুলোর বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চুক্তির সব ধাপ কার্যকর হলে বাংলাদেশে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এই চুক্তি না হলে জাপানের বাজারে শুল্ক সুবিধা হারিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত কমে যেতে পারত। সে কারণে সামগ্রিক লাভ-ক্ষতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে শুল্ক ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বর্তমানে এশিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য জাপান। দেশটিতে বছরে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ২০০ কোটি ডলার, যার বড় অংশই তৈরি পোশাক। অন্যদিকে জাপান থেকে বাংলাদেশের আমদানি গত কয়েক বছরে ১৮০ কোটি থেকে ২৭০ কোটি ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে।

