বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
জাপানের নতুন সংসদে চুক্তিটি অনুমোদনের পরপরই এটি কার্যকর হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ জাপানকে এক হাজার ৩৯টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে, বিপরীতে জাপান বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিচ্ছে ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যে।
গতকাল সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সম্মেলনে বক্তব্য দেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান।
চুক্তি স্বাক্ষর ও আলোচনার প্রেক্ষাপট
গত শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) জাপানের রাজধানী টোকিওতে ইপিএ চুক্তিতে স্বাক্ষর হয়। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পক্ষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও এতে স্বাক্ষর করেন। গত বছরের ২৪ মার্চ শুরু হওয়া আলোচনা সাত দফায় ২১টি বিষয়ে সমঝোতার মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়।
শুল্ক ছাড়ের কাঠামো ও সময়সীমা
চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই নির্দিষ্ট এক হাজার ৩৯টি পণ্যে জাপান বাংলাদেশের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। তবে বাণিজ্য সচিব জানান, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) নীতিমালা অনুযায়ী মোট পণ্যের ৮০ শতাংশে শুল্ক সুবিধা দিতে হবে, যা ৫ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ১৮ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ট্যারিফ লাইনে মোট ৭ হাজার ৪৫৮টি পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে খাদ্যপণ্য, তুলা ও সুতা ইতোমধ্যে শূন্য শুল্কে আমদানি হচ্ছে। মেশিনারিজ পণ্যে শুল্ক মাত্র ১ শতাংশ। এই শূন্য ও স্বল্প শুল্কের পণ্য মিলিয়েই জাপানকে এক হাজার ৩৯টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব প্রভাব ও অর্থনৈতিক হিসাব
বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, প্রাথমিকভাবে এই চুক্তির কারণে বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা বা তার কম রাজস্ব কমতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান শূন্য ও স্বল্প শুল্ক কাঠামোর কারণেই রাজস্ব প্রভাব সীমিত থাকবে।
পণ্যের পাশাপাশি সেবা খাতেও চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ১২০টি সেবা খাত জাপানে শুল্কমুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে। বিপরীতে বাংলাদেশ জাপানের ৯৮টি সেবা খাত উন্মুক্ত করেছে। বর্তমানে ফাইভ স্টার হোটেল ও মোবাইল ফোন সেবা খাত জাপানের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। এর ফলে সেবা খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
চুক্তির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো তৈরি পোশাক খাতে সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন সুবিধা। এর ফলে কাপড় আমদানি করে মাত্র ৩০ শতাংশ ভ্যালু অ্যাডিশনের মাধ্যমে জাপানে পোশাক রপ্তানি করতে পারবে বাংলাদেশ। এতে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।
বাণিজ্য সচিব জানান, জাপানে সম্প্রতি নির্বাচন হওয়ায় সংসদে চুক্তিটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হতে কিছুটা সময় লাগবে। অনুমোদনের পরপরই চুক্তি কার্যকর হবে। তবে বাংলাদেশের জন্য তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই, কারণ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাপানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে, যা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
ইপিএর চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর ডাব্লিউটিও কাঠামো অনুযায়ী বাণিজ্য উদারীকরণ করতে হবে। সেই সময় দেশের ব্যবসায়ীরা যদি সক্ষমতা বাড়াতে না পারে, তাহলে এই চুক্তি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তবে ১৮ বছরের দীর্ঘ সময়সীমা বিভিন্ন খাতে সক্ষমতা তৈরির সুযোগ দেবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তারাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
এই চুক্তির ফলে জাপানে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে বলেও আশা করা হচ্ছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, ইতোমধ্যে জাপানে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি যাওয়া বেড়েছে। ভবিষ্যতে জাপান বাংলাদেশে একাধিক ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে পারে। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ কর্মীরা জাপানের বিভিন্ন খাতে চাকরির সুযোগ পাবেন।

